

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হলেও এখনো আলোচনায় রাজধানী ঢাকার ২০টি আসনসহ ঢাকা বিভাগের আসনগুলোর বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের ভোটের মেরূকরণ। কে কত ভোট পেল, কেন পরাজিত হলেন, নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী না থাকলে ফলাফল কেমন হতো। এবং কত ভোটের ব্যবধানে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এসব বিষয়ে নিয়ে দলের নেতাকর্মী ও অনুসারীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন।
রাজনৈতিক দলগুলো নেতারা মনে করেন রাজধানী ঢাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেই পুরোদেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব। তাই সব দলের করা নজর ঢাকার আসনগুলোতে। তবে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ৭টি আসনে জামায়াত ইসলামী ও এনসিপির কাছে পরাজয় বরণ করেন বিএনপি প্রার্থীরা।
একইভাবে ঢাকা বিভাগে ৭০ আসনের মধ্যে ১৩টি আসনে বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হয়েছে। এরমধ্য এনসিপি ১টি ও জামায়াত ইসলামীসহ অন্যান্য দল ১২টি আসনে জয়ী হয়েছেন। তবে পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে আসনগুলোতে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী, যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দেওয়া, ৫ আগস্টের পর দলীয় পরিচয় চাঁদাবাজিকে দুষছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
পরাজিত হওয়া আসনগুলোর দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, ঢাকা-১২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাইফুল আলম ৫৩ হাজার ৭৭৭ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল আলম নীরব পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট; কিন্তু বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নীরব যদি নির্বাচন না করে ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে সমর্থন দিতেন এই আসনটি বিএনপির হাত ছাড়া হতো না এবং প্রায় ৭ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হতেন সাইফুল হক। একইভাবে ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার আরমান ৯৬ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সানজিদা ইসলাম তুলি ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন ৮০ হাজার ৯২৭ ভোট। সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে তিনিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। ১৬ হাজার ৩২৮ ভোট পেয়েছেন। তিনি যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন না করতেন বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির ঝুলিতে যোগ হতো আবু বকর সিদ্দিকের ভোটগুলো। এবং জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করেন দলের নেতাকর্মীরা।
একইভাবে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাইয়ুমের চেয়ে ২ হাজার ৩৯ ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী মো. নাহিদ ইসলাম। ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী তানভীর আহমেদকে পরাজিত করে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন প্রায় ৩ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জয়ী হয়েছেন। জামায়াতের আরেক প্রার্থী মোহাম্মদ কামাল হোসেন ঢাকা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. নবীউল্লাহ নবীকে ৯ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেছেন। ঢাকা-১৬ আসনে ৮৮ হাজার ৮২৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন দাঁড়িপাল্লার আব্দুল বাতেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের আমিনুল হক পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৬৭ ভোট।
এসব আসনেও বিএনপির প্রার্থী পরাজিত হওয়ার কারণ হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের মধ্যে থেকে যোগ্য নেতাদের মনোনয়ন না দেওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষোভ ও কোন্দলের কারণে পরাজিত হয়েছেন। যার কারণে বিজয়ী হওয়ার কাছাকাছি এসেও অল্প কিছু ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হতে হয়েছে। এবং ৫ আগস্টের পর দলীয় পরিচয় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির কারণে দলের দুর্নাম ছড়িয়েছে। আর এসবের প্রভাব পড়েছে ভোটের মাঠে। উদারণ হিসেবে ঢাকা- ৭ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী শেষ সময় প্রত্যাহার করায় বিএনপির প্রার্থী হামিদুর রহমান জয়ী হয়েছেন বলে মনে করেন। একইভাবে ঢাকা-৮ আসনের চিত্র তুলে দলীয় নেতাকর্মীরা বলেন, ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। প্রতিদ্বন্দ্বী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী থেকে মাত্র ৫ হাজার বেশি ভোটে পেয়ে জয়ী হয়েছেন। মির্জা আব্বাস একজন সিনিয়র নেতা; কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দুর্নামের কারণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মতো একজন প্রার্থীর সঙ্গে মির্জা আব্বাসের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। তবে এসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে দলের মধ্যে যোগ্য নেতাদের দল মনোনীত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন।
গত মঙ্গলবার সারা দেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একযোগে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ২০৯ আসনে জয়ী হয়ে অনেকটা স্বস্তি নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দল বিএনপি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকালে আগামী তিন দিনের মধ্যে নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পরাবেশ প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
সেই সূত্রে সব দলের নজর থাকে ঢাকার আসনগুলোতে। পাশাপাশি ঢাকার বিভাগের আসনগুলোকেও একইভাবে গুরুত্ব দেন রাজনীতিবিদরা।