আলী ইব্রাহিম
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ০৩ জুন ২০২৬, ১০:২১ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

কাস্টম হাউস নয়, যেন হয়রানির আঁতুড়ঘর

এনবিআরের রুলিং উপেক্ষা করে চালান আটকে নতুন অজুহাত
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

শিল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য রক সল্ট আমদানি করে ওয়ারদা অ্যান্ড জুবায়ের এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি। হুট করে গত ৪ মে বিল অব এন্ট্রি সাবমিট করার পর প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের চালান আটকে দেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা। চালানটি আটকে রেখে শিল্প মন্ত্রণালয় ও লবণ নীতিসহ নানা প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যতা চাওয়া হয়। যদিও কাস্টমসে এ ধরনের কোনো আইন রয়েছে বলে আমদানিকারককে দেখাতে পারেননি শুল্ক কর্মকর্তারা। তবু পণ্য চালানটি আটকে রেখে শুরু হয় নানা টালবাহানা। পরে উপায় না দেখে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয় প্রতিষ্ঠানটি এবং আদালতে রায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষেই আসে। তবে ঈদুল আজহার আগে পক্ষে রায় পেলেও পণ্যের চালানটি খালাস করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। কৌশলে আদালতের রায়ের কপি গ্রহণ না করে কমিশনার ঈদের ছুটিতে ঢাকায় চলে আসেন। এরই মধ্যে পণ্যের চালানের দামের তুলনায় প্রায় দিগুণ হয়ে গেছে পোর্ট চার্জ। কাঁচামাল আটকে যাওয়ায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন। এ কারণে ঈদে কর্মচারীদের ঠিকমতো বেতন-বোনাস পর্যন্ত দিতে পারেননি প্রতিষ্ঠানটির মালিক। এভাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে প্রতিদিনই হয়রানির শিকার হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এটা যেন কাস্টম হাউস নয়, এ যেন এক হয়রানির আঁতুড়ঘর।

সরেজমিন ঘুরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আমদানিকারকদের হয়রানির এমন ঘটনা আরও পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে স্টিল স্ট্রাকচার আমদানি করেন এক আমদানিকারক। প্রথমবারের মতো আমদানি করা পণ্যে চালানটি আটকে দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অডিট ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিসার্চ উইং (এআইআর) শাখা। স্টিল স্ট্রাকচার নিয়ে এর আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অ্যাসেসমেন্ট কমিটির সিদ্ধান্ত রয়েছে। এ ছাড়া কাস্টম হাউসের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি নির্দেশনাও রয়েছে। এর বাইরেও ওয়ার্ল্ড কাস্টম অর্গানাইজেশনের একটি ব্যাখ্যা রয়েছে। এতকিছুর পরও এআইআর শাখার কর্মকর্তাদের মনে হয়েছে স্টিলের স্ট্রাকচারটি ফার্নিচার পার্টসের এইচএস কোড অনুযায়ী শুল্কায়ন হবে। এরপর সব আইনের ঊর্ধ্বে উঠে কর্মকর্তারা সেই অনুযায়ী শুল্কায়নের জন্য রিপোর্ট দেন এবং প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলেও সুপারিশ করেন। প্রতিষ্ঠানটি এনবিআরের রুলিং দেখানোর পর পণ্য চালানটি আটকে রাখতে নতুন যুক্তি উপস্থাপন করেন কর্মকর্তারা—এটা রুলিংয়ের সঙ্গে যায় না। কর্মকর্তাদের নতুন যুক্তি, রুলিংয়ে একই পণ্য আলাদা তিনটি কনটেইনারে আনা হয়েছিল। এ চালানে একটি কনটেইনার, তাই এইচএস কোড পরিবর্তন হয়েছে। আর এতে মিথ্যা ঘোষণা হয়েছে। এ ছাড়া এনবিআরের এ রুলিং সঠিক নয় বলেও দাবি করেন কর্মকর্তারা। যদিও রুলিং সঠিক নয়—এ কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বলতে রাজি নন এআইআরের উপকমিশনার। সর্বশেষ নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থেকেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। এতে আমদানিকারকের মাত্র আঠারো হাজার ডলারের পণ্য এখন দেড় কোটির ঘরে গিয়ে ঠেকেছে। মজার বিষয় হলো, স্টিল স্ট্রাকচার শুল্ক কর্মকর্তাদের বদৌলতে হয়ে গেল ফার্নিচার পার্টস, আর আমদানিকারক রাতারাতি হয়ে গেল শুল্ক ফাঁকিবাজ।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই প্রতিনিয়ত ছোট ব্যবসায়ীদের হয়রানি করেন এআইআর শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদ ও আরেফিন। তাদের টিম লিডার হিসেবে আছেন এআইআর শাখার উপকমিশনার তারেক মাহমুদ। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে এআইআরের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং সদ্য সাময়িক বরখাস্তের আদেশ থেকে মুক্তি পাওয়া চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার আমীমুল ইহসানের সঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে গিয়ে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ফোনে একাধিকবার কল দিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার সাড়া মেলেনি। পরবর্তী সময়ে এআইআর শাখার উপকমিশনার তারেক মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কালবেলাকে বলেন, ওয়ার্ল্ড কাস্টম অর্গানাইজেশনের ব্যাখ্যা মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে বাংলাদেশে মানা হয়। আর এনবিআরের রুলিং মানার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে স্টিল স্ট্রাকচারের চালানটি এ রুলিংয়ে যথাযথ নয়। কারণ হিসেবে ওই কর্মকর্তা বলেন, রুলিংয়ে যে পণ্য চালানের বিষয়টি ছিল ওখানে তিনটি আলাদা আলাদা পণ্য চালান ছিল। আর এটি একটি পণ্য চালান। যেহেতু তিনটি নয়; তাই এ সুবিধা এ আমদানিকারক পাবেন না।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে আটকে রাখার জন্য এ ধরনের আরও উদ্ভট কিছু যুক্তিও মিলেছে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ওয়ারদা অ্যান্ড জুবায়ের ইন্ডাস্ট্রিজের শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে রক সল্ট আমদানির ক্ষেত্রে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ ইয়াছির আরাফাত কালবেলাকে বলেন, প্রায় এক মাসের কাছাকাছি হয়ে গেছে পণ্য চালানটি আটকে রেখেছে কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। আমরা বিডা নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠান। বিডার অনুমতি সাপেক্ষে আমরা আমদানি করে থাকি। আমদানি নীতি আদেশেও কোনো বাধা নেই। অযথাই হয়রানি করে আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। কমিশনারের মেইলে আদেশের মূল কপি পাঠানো হলেও তিনি রিসিভ করেননি ঈদের আগে। এরই মধ্যে পণ্য চালানটির দামের প্রায় দ্বিগুণ পোর্ট চার্জ এখন পরিশোধ করতে হবে। আর উৎপাদন এবং কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ঈদের আগে আমি ঠিকমতো কর্মচারীদের বেতন-বোনাস দিতে পারিনি।

শুধু এ দুটি প্রতিষ্ঠান নয়, শিল্প প্রতিষ্ঠানের পণ্য চালানও আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, সব নিয়ম মেনে আমদানি করা ঢাকার একটি বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের তিন কনটেইনার পণ্য আটকে দেন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মুহা. মাহবুবুর রহমান। বৃষ্টির মধ্যে ট্রাকে লোড হওয়া পণ্য নষ্ট হলেও সর্বশেষ আট দিন পর ছেড়ে দেন। পরবর্তী সময়ে আরেকটি বন্ডেড পণ্যের চালান আটক করলেও পরে অদৃশ্য কারণে ছেড়েও দেন। এ ছাড়া এ কমিশনার নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে কথা বলতে সরাসরি এবং ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া হয়রানির নানা অভিযোগের কথা উল্লেখ করে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানের বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানোর পর তিনি বার্তা দেখলেও কোনো বক্তব্য দেননি।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর টিমের বিরুদ্ধে পান থেকে চুন খসলেই ছোট ব্যবসায়ীদের আইনি ঝামেলায় ফেলার অভিযোগ বেশ পুরোনো। বিগত দিনে কেমিক্যাল থেকে শুরু করে অবৈধ সিগারেট আমদানি বন্ধে তৎপর হলেও বর্তমান টিম রহস্যজনক কারণে ঠুঁটো জগন্নাথের ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন কাস্টম হাউসে শিট নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠলে এসব ক্ষেত্রেও এআইআর টিম যেন নীরব দর্শক। এ ছাড়া আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এ টিমের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদ ও আরেফিনের নেতৃত্বে ল্যাপটপের ব্যাটারির গ্রুপ দিয়ে অন্য পণ্যের চালান গেলেও আসাদ নিজে গিয়ে দেখেও তা ছেড়ে দেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ফাইন্ডিং নেই। মূলত বড় বড় আমদানিকারকের পরিবর্তে এ টিমের নজর ছোট ব্যবসায়ীদের দিকে। এতে বাইরে আলোচনা হবে—খুব কড়া কাস্টম হাউসের এ এআইআর টিম। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে এআইআর টিমের রাজস্ব কর্মকর্তা আসাদকে গতকাল সোমবার দফায় দফায় ফোন দিয়েও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কাস্টমসে হয়রানির শিকার হওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমও। এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিকেএমইএ সভাপতি রিনিউয়েবল এনার্জির প্লান্ট করতে পণ্য আমদানি করেন। প্রথম দিকে সোলার নিয়ে এলে সহজেই শুল্ক কর্মকর্তারা ছেড়ে দেন। তবে স্ট্রাকচার আনার পর আটকে দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কর্তৃপক্ষ। এ পণ্য চালানটি খালাস করতে ব্যবসায়ী নেতা হওয়ার পরও বেশ বেগ পেতে হয়েছে মোহাম্মদ হাতেমের। আর সময় লেগেছে প্রায় পনেরো দিন এবং এনবিআরের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। একই সঙ্গে গুনতে হয়েছে পোর্টের বড় অঙ্কের ডেমারেজ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম কালবেলাকে বলেন, প্রথম দিকে সোলার সহজে খালাস হলেও পরবর্তী সময়ে স্ট্রাকচার আটকে দেয় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এ চালানটির জন্য আমাকে এনবিআরের দ্বারস্থ হতে হয়েছে প্রজ্ঞাপন থাকার পরও। আর এ কারণে আমাকে পোর্ট ডেমারেজ দিতে হয়েছে ৩৫ লাখ টাকা।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘সম্পাদক পরিষদ’ গঠন হয় কীভাবে, জানালেন সাবেক এক সদস্য

মির্জা ফখরুলকে সারজিসের প্রশ্ন

৩০ বছর পর দখলমুক্ত সরকারি রাস্তা

হাদি হত্যায় তার বড় ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে : ফারুক হাসান

সরকারকে ধন্যবাদ দিয়ে ‘সব নিরপরাধ মায়ের’ মুক্তি চাইলেন আইভী

ওসির নেতৃত্বে থানায় স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত 

নিঃসঙ্গ মায়ের মৃত্যু ঘিরে ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগ ছেলের

রিজার্ভ আরও বাড়ল

মায়ানমারে পাচারের পথে বিপুল সিমেন্ট জব্দ, আটক ৯

কারামুক্ত আইভী লড়বেন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে

১০

পদত্যাগের দুদিন পর পার্বত্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি দীপেন দেওয়ানের বার্তা

১১

এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ

১২

৫ দিন দেশের আবহাওয়া কেমন থাকবে?

১৩

প্রিমিয়ার ব্যাংকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর নূরুল আলমের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

১৪

নিখোঁজের একদিন পর পতিত জমিতে মিলল বৃদ্ধার মরদেহ

১৫

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় চট্টগ্রামে বর্হিনোঙরে পড়ে আছে ৬০ কোটি টাকার জাহাজ

১৬

দেশে ফেরার পরই কারাগারে, সাবেক সেই প্রধানমন্ত্রী এবার পাচ্ছেন মুক্তি

১৭

যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে : আরাগচি

১৮

ইতিহাসের দীর্ঘতম সফরে নিউজিল্যান্ডে যাচ্ছে ভারত, খেলবে এক ডজন ম্যাচ 

১৯

টিকিট জালিয়াতির আন্তর্জাতিক ফাঁদ

২০
X