

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তার মায়ের হাহাকার আরও গভীর হয়ে উঠেছে। ‘মোর বাজানের ডাক আজও কানোত বাজে’—এই আর্তনাদে দুই বছরেও শেষ না হওয়া অপেক্ষার ছবি ফুটে উঠেছে। একদিকে বাবা মকবুল হোসেন ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় দিন গুনছেন, অন্যদিকে মা মনোয়ারা বেগম ঘরের প্রতিটি কোণে ছেলের স্মৃতি আগলে রেখে এখনো তার ফিরে আসার অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা বয়ে বেড়াচ্ছেন। গতকাল বুধবার দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের নিস্তব্ধতার মধ্যে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন শহীদ আবু সাঈদ। লাল-সবুজ রঙে রাঙানো স্টিলের বেড়া দিয়ে তার কবর ঘেরা। তিনজন ব্যক্তি কবরের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছিলেন। পাশের একটি বন্ধ মুদি দোকানের বারান্দায় অপলক দৃষ্টিতে ছেলের কবরের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন বাবা মকবুল হোসেন। কয়েকদিন আগে এক দুর্ঘটনায় তার বাঁ হাত ভেঙে গেছে। ব্যান্ডেজ করা হাতে ব্যথা নিয়েই তিনি কবরের পাশে বসেছিলেন।
মকবুল হোসেন বলেন, ‘জনগণ, সরকার পয়সা-কড়ি যাই কিছুই দেক, কিন্তু ছেলে হারানোর পর আমার কোনদিনই আত্মা ঠান্ডা হইল না। যদি আমার ছেলেটা জীবিত থাকতো, ওটাই একশ গুণ আমার ভালো। সম্মুখে থাকলে হয়, হয়তো চাকরি করলে হয়, বিয়েশাদি করলে হয়, বউ-ছইল হইল হয়। এটাই আমার একশ গুণ। এখন নাই যখন, এখন কী করি?’
শেষবার ছেলেকে বিদায় জানানোর স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কোরবানির আগের দিন বাড়িতে আসছিল। কোরবানি করে, খাওয়া-দাওয়া করে এক বন্ধুর বিয়ে খাইতে গেছিল। ওখানে এক-দুইদিন থাকি আসি বেলা ৩টার দিকে ব্যাগ পিঠে নিয়ে বলতেছে আব্বা আমি যাচ্ছি। আমি বললাম, ঠিক আছে বাবা, যা। ওই পর্যন্তই কথা শ্যাষ। পরে তো লাশ আসলো।’
ছেলের মেধার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘যে হিসেবে মেধাবী ছিল তাতে কোন অফিসার পদে যাইত, এই রকম যোগ্য ছিল। সেটা তার ভাগ্যে নাই, হয় নাই।’ হত্যা মামলার রায় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। তবুও রায় ঘোষণা করছে, এটাই অতি দ্রুত কার্যকর করা হোক। আমার সরকারের কাছে এটা দাবি। রায় হওয়ার এখন পর্যন্ত দুই-তিন মাস হয়ে যাচ্ছে। রায় কার্যকর বা এখন পর্যন্ত কোনো বিচারের অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।’
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মোট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান, রবিউল ইসলাম ও বিভূতিভূষণ রায়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। বাকি ২৫ আসামিকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা, শিক্ষক, প্রশাসনের সদস্য, পুলিশ কর্মকর্তা এবং ছাত্রলীগের নেতারাও রয়েছেন।
কবরের পাশেই আবু সাঈদদের বাড়ি। উঠানে দেখা যায়, মা মনোয়ারা বেগম আঙিনার আগাছা পরিষ্কার করছেন। পরে তিনি ছেলের পড়ার ঘরে নিয়ে যান। ঘরের প্রতিটি কোণ এখনো ছেলের স্মৃতিতে ভরা। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে হত্যার দুই বছর হইছে। অনেক মানুষ আইসোছে, অনেক ভিড় হওছে, সাংবাদিকরাও আইসোছে। আমার ছেলে তো ফিরে আইসোছে না আবার। আমার এটাই আমার দুঃখ। প্রকাশ্য আমার ছইলোক দেখতে পারোছিনে, এটাই আমার মনের দুঃখ বেশি।’
ছোটবেলার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে আবু সাঈদ অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করতেন। ঝড়বৃষ্টি হলেও থামতেন না। বৃষ্টির দিনেও চেয়ার নিয়ে বসে সারারাত পড়াশোনা করতেন। সবাই ঘুমালেও তিনি পড়তেন। মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার সন্তান তো গেল। স্বপ্ন তো পূরণ হলো না। ছেলের স্বপ্ন পূরণ হলো না। চাকরির সময় আসি ছেলে গেল। আমার ছেলে সবার জবার জন্য দাঁড়াইছে। তার স্বপ্ন পূরণ না হলেও সবারই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু আমার ছেলের দুনিয়াতে নাই, এটাই আমার দুঃখ।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মোর বাজানের ডাক আজও মোর কানোত বাজে। ঠিকমতো নিন্দো আইসে না। নিন্দোত থাকি জাগি মুই একলা একলাই কান্দো। মোর বুকটা ফাটি যায়। যে রায় হইছে, তাদেক ফাঁসি দেয় না ক্যান।’
কোটা সংস্কার আন্দোলন সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ার পর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন সংগঠিত করেছিলেন আবু সাঈদ। আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। ছাত্রলীগের হামলা ও তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চাপের মুখেও তিনি পিছু হটেননি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন বলেন, ১১ জুলাই আন্দোলনের কর্মসূচিতে হামলার সময় আবু সাঈদকে চড়-থাপ্পড় মারা হয় এবং তার গলা চেপে ধরা হয়। এরপরও তিনি দমে যাননি। ১৫ জুলাই তাকে রংপুর ছেড়ে যেতে ও আন্দোলনের নেতৃত্ব না দিতে হুমকি দেওয়া হয়। ১৬ জুলাইও তিনি আন্দোলনের মাঠে ছিলেন। পুলিশের বন্দুকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালে সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ তিনি। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে। তার দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকার সেই দৃশ্য দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। এরপর কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলন একদফায় রূপ নেয়।
শহীদ আবু সাঈদের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক ও ছাত্র-জনতার শক্তির মধ্যে এখন বিভাজন তৈরি হয়েছে। বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে এটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি চান, জুলাইয়ের সব শক্তি আবার একত্রিত হোক। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের জন্য রাষ্ট্র দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুক।
এদিকে আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণে ঘোষিত উন্নয়ন প্রকল্পও দুই বছরেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। প্রায় ১ হাজার ৯০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই ‘আবু সাঈদ তোরণ ও মিউজিয়াম’ এবং ‘শহীদ আবু সাঈদ স্মৃতিস্তম্ভ’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও দৃশ্যমান কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। পরিবার ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নানা ঘোষণার পরও কার্যকর উদ্যোগ নেই। আহত শিক্ষার্থী রিফাত হোসেন রাফি বলেন, জাদুঘরের কাজ শুরু হয়নি। স্মৃতিস্তম্ভও কাগজপত্রেই আটকে আছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দ পেলেই প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হবে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত ‘শহীদ জুলাই দিবস’ উপলক্ষে পীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্রসংগঠন কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিশেষ দোয়া, মোনাজাত, কোরআন খতম, স্মৃতিচারণ ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দুই বছর পরও পরিবারের একটাই দাবি, ঘোষিত রায় দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হোক। একই সঙ্গে আবু সাঈদের আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মের কাছে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকুক।