

এনজিও পরিচালকরা বাগড়া দেওয়ায় প্রায় সাড়ে চার হাজার স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে রাজধানীসহ বিভিন্ন নগর এলাকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষকে বেসরকারিভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন এই স্বাস্থ্যকর্মীরা। সরকার সম্প্রতি তাদের রাজস্ব খাতে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও এনজিওগুলো তথ্য সরবরাহ করছে না। অন্যদিকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়ন বন্ধ করায় তারা ছয়-সাত মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। বকেয়া বেতন না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে সংকটে দিন পার করছেন তারা। একই সঙ্গে কয়েকটি এনজিওর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, অতিরিক্ত সেবামূল্য আদায়, কেনাকাটায় দুর্নীতি, কর্মী ছাঁটাই এবং বেতনবৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে দেওয়া একটি লিখিত আবেদন, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, ১৯৯৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রকল্প’ চালু হয়। বর্তমানে ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ১৩টি পৌরসভায় ২১টি এনজিওর মাধ্যমে প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি সরকার এগুলো স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু করেছে। ১৯২টি সরকারি ভবনে পরিচালিত নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে প্রক্রিয়া শুরু করেছে মন্ত্রণালয়। তবে ভাড়া ভবনে পরিচালিত আরও ৯৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো এই প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে। ফলে সেখানকার প্রায় সাড়ে চার হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সূত্র বলছে, চলতি মাসের ১২ তারিখে তৃতীয়বারের মতো সরকার এনজিওগুলোর কাছে তথ্য চাইলেও তারা ৯৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য প্রদান থেকে বিরত আছে। কারণ তারা এগুলো নিজেরাই পরিচালনা করতে চায়।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এ-সংক্রান্ত একটি সভায় এনজিওদের পক্ষ থেকে এই ৯৭টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আরও এক বছর পরিচালনের অনুমতি চাওয়া হয়। তারা বলেন, এক বছর যদি তারা ভালো করে চালাতে পারেন তাহলে সরকারি খাতে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে আপত্তি জানান।
এনজিওগুলো হচ্ছে সীমান্তিক, বিএপিএএসএ, ড্যাম, পিএসটিসি, এডামস, নারীমৈত্রী, ইউটিপিএস, চট্টগ্রাম সিটিজি, এমএএমএটিএ, লাইট হাউস, এফপিএবি, পিএসকেপি অ্যান্ড পিপিএস, গোপালগঞ্জ পাওয়ার, কুষ্টিয়া পাওয়ার, তিলোত্তমা, রিক, পদক্ষেপ, উন্নয়ন, আরটিএম, তারাবো পাওয়ার, সামাহার। এই এনজিওগুলো সারা দেশে নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করে আসছে।
এডিবি অর্থায়ন বন্ধ করলে এনজিওগুলো সেবার মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এতে দুর্ভোগে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ। ২০২৫ সালে ইফনিটি থ্রো পপুলেশন সার্ভিস (ইফটিপিএস) কর্মীদের এক নির্দেশনা জারি করে। সেখানে তারা উল্লেখ করে, প্রতিটি ক্লিনিক মাসে ৩০ হাজার টাকার কম আয় করলে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এফডব্লিউএ/এসপিদের প্রতি মাসে সাতটি ডেলিভারি করতে হবে, ব্যর্থ হলে এক হাজার টাকা বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে। আয়া-পিয়ন ছাড়া বাকি কর্মীদের মাসে অন্তত একটি করে ডেলিভারি রোগী আনতে হবে। অন্যথায় এক হাজার টাকা বেতন থেকে কেটে নেওয়া হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের আগস্ট মাসে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ৫০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন কাটা হয়।
কুড়িগ্রাম রিকের একজন স্বাস্থ্যকর্মী জানান, সেখানে কর্মী ছিলেন ৩২ জন। কিন্তু সিভিল সার্জন অফিসে লিস্ট দেওয়া হতো ৩৯ জনের। এমন আরও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনজিও নারীমৈত্রীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল দুদকে। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্ত কমিটির সামনে সাক্ষাতের জন্য ঢাকা হয়।
নারীমৈত্রীর প্রোগ্রাম ম্যানেজার ওসাং প্রো বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে যখন যে তথ্য চাওয়া হয়েছে, আমরা দিয়েছি। অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বিষয়ে বলেন, যখনকার অভিযোগ তখন তিনি এই প্রতিষ্ঠানে ছিলেন না। তিনি বলেন, নগর স্বাস্থ্য নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মধ্যে নারীমৈত্রী সবচেয়ে ভালো কাজ করে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপপ্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর আমরা এক বছর কার্যক্রম চালিয়েছি, কোনো সমস্যা হয়নি। যেসব অভিযোগের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আমার জানা নেই।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে এনজিওগুলো সেবার জন্য অর্থ নেওয়া শুরু হয়। প্রকল্প নীতিমালা অনুযায়ী মোট সেবাগ্রহীতার ৩০ শতাংশ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ‘লাল কার্ড’-এর মাধ্যমে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সেই সুবিধা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে লাল কার্ডধারীদের (বিনামূল্যে সেবাগ্রহীতা) কাছ থেকেও অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যা এই প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।
সেবামূল্য ৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তালিকায় দেখা যায়, আগে ওপিডি চিকিৎসা পেতে ব্যয় করতে হতো ৫০ টাকা, বর্তমানে সেটি ১০০ টাকা। একইভাবে গর্ভকালীন পরীক্ষা এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা পেতে রোগীকে ব্যয় করতে হতো ৫০ টাকা, এখন ব্যয় করতে হচ্ছে ১০০ টাকা। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে সিবিসি ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা; এইচবি ৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা, এইচবিএসএজি ১৭০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫০ টাকা; সিআরপি ১৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা, আরএ ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা; এএসও ১৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা; ক্রসম্যাচ ২০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা; এমআর ৫০০ টাকা থেকে ২৫০০ টাকা; পিএসি ১০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০০ টাকা; সিজার আগে ছিল ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, বর্তমানে করা হয়েছে ১৫ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা; স্বাভাবিক প্রসব আগে ছিল ১০০০ টাকা, এখন ২৫০০ টাকা। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স সেবামূল্য ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলেন, স্বাস্থ্যসেবাকে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের পরিবর্তে রাজস্বনির্ভর ব্যবসায়িক কাঠামোয় পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি স্বাস্থ্যকর্মীরাও পেশাগত নিরাপত্তা হারাচ্ছেন।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থায়ন থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী পাঁচ, ছয় এমনকি সাত মাস পর্যন্ত বেতন পান না। এতে তাদের পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। সন্তানদের লেখাপড়া, চিকিৎসা ব্যয় এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। একই সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অস্বচ্ছতা, অতিমূল্যে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র কেনা, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং প্রকল্প তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম হচ্ছে।
কর্মচারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কর্মরত ও সাবেক কর্মকর্তাদের কাছে এসব অনিয়মের বিভিন্ন নথি, বিল-ভাউচার এবং ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তারা প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ দিতে প্রস্তুত। তারা আরও বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে গড়ে ওঠা এই দক্ষ জনবলই নগর এলাকার মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, পুষ্টি, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, রোগী কাউন্সেলিং এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি। এই জনবল হারিয়ে গেলে নগর স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে নগর স্বাস্থ্যকর্মী ইউনিয়নের আহ্বায়ক ডা. সালেহা খাতুন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে কর্মরতদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত বা স্থায়ী নিয়োগ প্রদান করতে হবে। পাশাপাশি সব পর্যায়ের কর্মীর চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম বলেন, আমরা নগর স্বাস্থ্য সম্পৃক্ত সবাইকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে আত্তীকরণ করতে চাই। কাউকে বাদ নয়। কারণ সরকারের কাঙ্ক্ষিত নগর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সবার সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীদের দক্ষতাকে কাজে লাগানো। একই সঙ্গে প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যদি কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকে, তবে জনস্বার্থে তা স্বাধীনভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।