

প্রায় সতেরো বছর পর তারেক রহমান আজ যখন দেশে ফিরছেন, তখন বিশ্বরাজনীতি, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির চিত্রটি জটিল। বিএনপির রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে সর্বশেষ সময়ে (২০০১-০৬) সংঘটিত সব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচার এবং শাস্তি বিএনপির হাতেই শুরু হয়। তবে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ছিল অন্য—পরবর্তী সময়ে তাদের লক্ষ্য ও বিন্যাসে সন্ত্রাসী বা অপরাধী না হয়ে, হয়ে ওঠে বিএনপির নেতাকর্মী। অর্থাৎ, বিএনপির নেতাকর্মীরা টার্গেটে পড়ে যায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ নির্বাচনহীন নতুন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার দুঃসহ অভিজ্ঞতা লাভ করে। ‘বাকশাল-২’ কায়েমের মধ্য দিয়ে যতটা পারা যায় মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে বিএনপির নেতৃত্বকে কালিমালিপ্ত করা হয়। যার সবকিছুই আজ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করার বাকশালী চক্রান্তও আজ সুদূর অতীত মাত্র। তারেক রহমানের বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন ঘিরে আজ দেশে রাজনীতি আবর্তিত। সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও স্বাভাবিক বিষয় বর্তমানে নতুন এক বাংলাদেশ এবং পুনর্গঠনের মহানায়ক তারেক রহমান। যদিও তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানান চক্রান্তও কিন্তু থেমে নেই।
গত ফ্যাসিস্ট আমলে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, লাখ লাখ হামলা-মামলা মোকাবিলা করেছেন এবং দলের মধ্যে প্রকাশ্য বিভাজন না হলেও স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ ফ্যাসিজম বিএনপির দেশীয় নেতৃত্বের একটা অংশকে পুরোনো রাজনীতির খোলসে মুড়িয়ে রাখা হয়েছে। তারেক রহমান এমন সময় দেশে ফিরছেন, যখন বিএনপি দলীয়ভাবে নতুন বাস্তবতায়। তার প্রত্যাবর্তন তাই শুধু দেশে আসা নয়, বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতি উন্নত মঞ্চে পরিচ্ছন্ন এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রায় জনবান্ধবনীতি অনুসরণ করছে। তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় ও কোটি কোটি নতুন ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের শুরুর যাত্রা শুরু হয়েছে। আর এ নতুন বিন্যাসে অপরিহার্য একজন নেতা তারেক রহমান মহান আলোকবর্তিকা হয়ে আসছেন।
দীর্ঘ ফ্যাসিজমের চরম নিকৃষ্টকালে আপসহীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জালিমের কারাগারে বন্দি ছিলেন; তারেক রহমান ছিলেন নির্বাসিত। যে কোনো রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে এ অবস্থায় কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়। একটি হলো দলীয় আদর্শের সংকোচন! বাংলাদেশে যে কারণে মানুষ রাষ্ট্রপতি জিয়াকে ভালোবেসে ‘শহীদ’ সম্বোধন করে, যে কারণে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী এবং পুরো জাতির অভিভাবকরূপে শ্রদ্ধেয়া হন, তা তৈরি হয়েছে তাদের দলীয় আদর্শকে সমুন্নত রেখে দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ ও উৎসর্গের মাধ্যমে। যে কোনো রাষ্ট্রনায়কের জন্যই তা অত্যন্ত গৌরবজনক।
তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক গুরুত্ব হলো, মানুষ দীর্ঘদিন পর বিএনপির (আইডিওলজিক্যাল ফ্রেমওয়ার্ক) আদর্শগত কাঠামো এবং সামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে সুসংঘবদ্ধ অবয়বে জীবনের নিত্যপ্রয়োজনে কাছাকাছি পাবে। দেশ গড়ার নতুন কাজে নিবেদিত হতে লক্ষপ্রাণ তরুণ-যুবক, মা-বোন প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। শুধু নির্দেশনা চাই প্রিয় নেতার। একজন অভিভাবক, একজন দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের হাত ধরে বাংলাদেশ নিয়ে অনেক অনেক স্বপ্ন তাদের। তার দেওয়া ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করতে চায়। বাংলাদেশকে সত্যিকারের মানবিক বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ায় পাশাপাশি হাঁটতে চায় সবাই। ঐক্যবদ্ধ হয়ে পুনর্নির্মাণের অংশীদার হতে চায়।
তারেক রহমান প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ, তথ্যপ্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা, নতুন দিগন্ত, নতুন রাষ্ট্রনীতি, জনকল্যাণ নীতি, দলীয় শৃঙ্খলা, ধর্ম ও সাংস্কৃতিক উৎসবের সামাজিক পরিকাঠামো বিন্যাস, পারস্পরিক সহমর্মিতা, সহযোগিতা ইত্যাদির উন্নত মনোভাব তৈরিতে মনোযোগী থাকবেন। দেশের মানুষের বিশ্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আগামীর কান্ডারি হয়ে নেতৃত্ব দিতে হবে তাকে। দেশের প্রতিটি ইঞ্চির সার্বভৌমত্বের আত্মবিশ্বাস দেশের মানুষের মনে প্রোথিত করার জন্যই, জনসংখ্যামাফিক দেশের অর্থনৈতিক বিবেচনায় সর্বোচ্চ শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন, বাহিনীগুলোর মর্যাদা, আধুনিকীকরণ, আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ—এসবই আগামীর বাংলাদেশে সাজাবেন তিনি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং বিনয়ের আদলে।
এ দেশের মানুষ শান্তিপ্রিয়, কিন্তু কারও বশ্যতা শিকার এ দেশের মানুষের মধ্যে নেই। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারনি এ দেশকেই বলেছিলেন ‘বুলগাকপুর’ (বিদ্রোহের নগরী)। বাংলাদেশের ইতিহাস প্রথম নিজ হাতে লিখতে চেয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার পরামর্শদাতারা যেমন অসম্ভব পণ্ডিত ও মেধাবী ছিলেন, তিনি নিজেও ছিলেন পরিশ্রমী ও দেশপ্রেমী। একজন ক্যারিয়ার আর্মি অফিসার হয়ে তিনি নিজ আগ্রহে রাজনীতি শিখেছেন।
রাজপথে রাজনীতি শিখেছেন খালেদা জিয়া। তিনি দেশের সীমানা নির্বাচন করেছিলেন। এক কথায় তিনি বিএনপির রাজনীতির আলপনা এঁকেছেন, ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা’—এমন উচ্চারণ যে কেউ পারেন না! দেশপ্রেম, সাহস, বিজ্ঞতা আর জনগণের ভালোবাসার দাবিতে তৈরি হয় এমন বোধ। এ বিশ্বাসের পেছনে রয়েছে গণতন্ত্রের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখার দৃঢ়তা। বিশ্বাস আর দেশপ্রেম মিলে জনতার কাতারে যেতে পারে যেসব নেতৃত্ব—শুধু তারাই বহন করেন সার্বভৌমত্বের পতাকা।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার এ পতাকার উত্তরাধিকার তারেক রহমানের হাতে। দেশপ্রেম দিয়ে মানবতার বাংলাদেশ গড়ায় এ পতাকাই প্রত্যয়। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তাই তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় বর্ণিল হয়ে উঠবে, দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক বলয়ে শ্রদ্ধেয় হবে। রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবেন তিনি।
ড. আবুল হাসনাত মোহা. শামীম
অধ্যাপক, গবেষক ও ট্রেজারার, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়