

বাংলা চলচ্চিত্রের পরিচিত মুখ পারভেজ গাঙ্গুয়া। তবে দর্শকের কাছে তিনি বেশি পরিচিত ‘গাঙ্গুয়া’ নামেই। একসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রে খল ও কৌতুকঘরানার চরিত্রে নিজের স্বতন্ত্র অভিনয়শৈলীর মাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের ব্যস্ততম সময়ের পর হঠাৎ করেই পর্দা থেকে হারিয়ে যান তিনি। দীর্ঘদিন তার অনুপস্থিতি নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল। অবশেষে নীরবতা ভেঙে নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ের কথা প্রকাশ করেছেন এই অভিনেতা। স্ট্রোক, পাঁচ বছরের প্যারালাইসিস, মানসিকভাবে ভেঙে পড়া, আত্মহত্যার চেষ্টা, তারপর দীর্ঘ সাত বছরের লড়াই শেষে আবার সুস্থ হয়ে ওঠার গল্প শুনিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, হজ পালন করতে পারলে অভিনয়জীবনকে চিরবিদায় জানাবেন।
গাঙ্গুয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, স্ট্রোকের পর তার জীবন মুহূর্তেই বদলে যায়। শরীরের একাংশ অবশ হয়ে যায়, মুখ, হাত-পা বেঁকে যায়। পাঁচ বছর তিনি পুরোপুরি প্যারালাইজড ছিলেন। এরপর আরও দুই বছর ধরে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি স্ট্রোক করেছিলাম। স্ট্রোক করে পাঁচ বছর প্যারালাইজড ছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে ঠিক হতে লেগেছে দুই বছর। সাত বছরের মাথায় আল্লাহ আমাকে মাফ করছেন, এখন আমি পুরোপুরি সুস্থ। আমাকে কেউ দেখে বুঝতে পারবেন না যে, আমি স্ট্রোকের রোগী ছিলাম।'
শুধু অসুস্থতাই নয়, সেই সময়ের প্রতিটি দিন ছিল অসহনীয় কষ্টের। গাঙ্গুয়া জানান, পাঁচ বছর বিছানা থেকেই উঠতে পারেননি। এমনকি বিছানাতেই প্রস্রাব-পায়খানা করতে হতো। নিজের অসহায় অবস্থার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমার মুখ, হাত-পা ব্যাঁকা, একেবারে প্যারালাইজড ছিলাম। বিছানা থেকে উঠতে আমার পাঁচ বছর লেগেছে। এভাবে দিনযাপন করতে করতে আল্লাহ আমাকে সুস্থ করেছেন।'
শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিকভাবে আরও বড় ধাক্কা ছিল মানুষের অবহেলা। গাঙ্গুয়ার দাবি, অসুস্থ হওয়ার পর চলচ্চিত্রাঙ্গনের কেউ তার পাশে দাঁড়াননি। কেউ আর্থিক সহায়তা করেননি, এমনকি খোঁজও নেননি। এ নিয়ে তার আক্ষেপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ একটি টাকাও সাহায্য করেনি, ফোনও দেয়নি। তখন বুঝেছি, আমাকে একমাত্র আল্লাহই দেখছেন। তাই বলুন, আমি আল্লাহর পথেই থাকব, নাকি আপনাদের সঙ্গে?’
এই কঠিন সময়ই তার জীবনবোধ পাল্টে দেয়। ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশীলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। ছেড়ে দিয়েছেন নেশা, সিগারেটসহ নানা অভ্যাস। এখন তার জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ইবাদত-বন্দেগি। গাঙ্গুয়া জানান, যদি এ বছর হজ পালন করতে পারেন, তাহলে সেটিই হবে তার অভিনয়জীবনের সমাপ্তি। তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে যতটুকু দেখতে পারছেন, এটাই হয়তো শেষ। আমি যখন হজ করব, আমাকে আর কখনো ফ্রেমে দেখবেন না। এটা আমার শপথ।’
চলচ্চিত্রজীবন নিয়ে তার আক্ষেপও কম নয়। তার বিশ্বাস, আরও আগে এই জীবন থেকে সরে আসা উচিত ছিল। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যদি আমাকে আরও আগে এই শিক্ষাটা দিতেন, তাহলে আরও আগেই ঠিক হয়ে যেতাম। আমি বুঝিনি, এইভাবে চলতে থাকলে আমার জীবন এমন হয়ে যাবে।’
অসুস্থতার সময় তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। তিনি মনে করেন, যদি আগের মতো সুস্থ হয়ে ফিরতে না পারতেন, তাহলে চলচ্চিত্রেও তার আর কোনো জায়গা থাকত না। গাঙ্গুয়ার ভাষায়, ‘আমি যদি খুড়িয়ে হাঁটতাম, শরীর বাঁকা থাকত, তাহলে আমাকে চলচ্চিত্রে কে নিত? পঙ্গু মানুষের তো চলচ্চিত্রে জায়গা নেই। এখন আবার সুস্থ হয়েছি বলেই সবাই আগ্রহ দেখাচ্ছে। যদি কাজ করি, সেটা হবে হজে যাওয়ার আগে শেষ কাজ।’
সাক্ষাৎকারে জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের কথাও অকপটে তুলে ধরেন তিনি। গাঙ্গুয়া জানান, প্যারালাইজড অবস্থায় একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। বাসার আটতলার ছাদ থেকে লাফ দিতে চেয়েছিলেন; কিন্তু শারীরিক অক্ষমতার কারণে উঠতেই পারেননি। আবার সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর আশায় গাড়ির সামনেও দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই ঘটেনি। এখন তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহই তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন। তাই মৃত্যুর জন্য নয়, বরং বেঁচে থাকার জন্যই এখন প্রার্থনা করেন। তার ভাষায়, 'এখন আল্লাহর কাছে বলি, আমাকে আরও কিছুদিন এই পথে রাখুন, যাতে নামাজ, দোয়া-কালাম আর কোরআন শরিফ নিয়ে জীবনযাপন করতে পারি।'
সিনেমার জীবন নাকি বর্তমান ধর্মীয় জীবন—কোনটি বেশি স্বস্তির, এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন গাঙ্গুয়া। তিনি বলেন, ‘কোথায় সিনেমা আর কোথায় আল্লাহ! আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা হয় না। সিনেমা শুধু কর্মস্থল। পৃথিবীতে জীবিকা অর্জনের অনেক পথ আছে, কিন্তু আল্লাহকে সবসময় সঙ্গে রাখতে হবে।’
সাত বছরের মৃত্যুযুদ্ধ শেষে আজ নতুন এক জীবনের গল্প লিখছেন পারভেজ গাঙ্গুয়া। যে মানুষটি একসময় বিছানায় পড়ে থেকে জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করছিলেন, সে মানুষটিই এখন সুস্থ শরীরে নতুন বিশ্বাস নিয়ে বাঁচতে চান। আর সেই পথচলার শেষ অধ্যায় হিসেবে তিনি বেছে নিতে চান হজ পালন এবং অভিনয়জীবন থেকে স্বেচ্ছাবসর। তার এই দীর্ঘ সাত বছরের লড়াই শুধু একজন অভিনেতার ফিরে আসার গল্প নয়, বরং জীবন, বিশ্বাস, ধৈর্য ও পুনর্জন্মের এক বিরল অধ্যায়।