

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নাম দিয়ে গত ৪ জুলাই গাজী মাহবুব নামের একজন চলচ্চিত্র পরিচালক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলেন, ‘৩ জন স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালককে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। তারা হলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক মহাসচিব বদিউল আলম খোকন, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক মনজুরুল ইসলাম মেঘ, উপমহাদেশের সর্কবনিষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, আহত জুলাই যোদ্ধা (গেজেটভুক্ত) রিয়াজুল রিজু।’
ঐ বহিষ্কারাদেশ অবৈধ দাবি করে, মিথ্যা সংবাদ প্রচার করার কারণে গাজী মাহবুবকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়ে ১০০ কোটি টাকার মানহানির কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করেছেন জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক রিয়াজুল রিজু। এছাড়াও টাঙ্গাইল সদর থানায় ১৯ জুলাই চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির ৩ সদস্যের বিরুদ্ধে জিডি করেছেন তিনি। জিডি নং: ১৪২৬। জিডিতে উল্লেখিত ৩ জন ব্যক্তি হলেন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহীন সুমন (৬০), সাধারণ সম্পাদক শাহীন কবির টুটুল (৪৩), সদস্য গাজী মাহবুব (৫৮)।
জিডি ও কারণ দর্শনোর নোটিশ প্রদান প্রসঙ্গে উপমহাদেশের সর্বকনিষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, আহত জুলাই যোদ্ধা (গেজেটভুক্ত) রিয়াজুল রিজু বলেন, ‘এই কমিটির কোন এখতিয়ার নেই এই ভাবে কারও সুনাম খর্ব করার, আমি ১৫ দিন অপেক্ষা করেছি, কোন নোটিশ পাই কিনা, যখন দেখলাম কেউ আমাকে নোটিশ দেয়নি, নোটিশ পেলে দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতাম। যেহেতু আমাকে কেউ নোটিশ দেয়নি, সেহেতু আমাদের সুনামহানি করতেই এই ধরনের একটি ঘৃনিত কাজ করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।’
রিজু আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতিতে জুলাই বিরোধীদের একটি সিন্ডিকেট সমিতি দখলে রেখে এই অপকর্ম গুলি করে যাচ্ছে, আমি একজন আহত জুলাই যোদ্ধা (গেজেটভুক্ত) কোন অন্যায় মেনে নিবো না। আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার, আমার অপূরণীয় সামাজিক সম্মান ক্ষতি যারা করেছে, তাদের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে।’
কারণ দর্শানো নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে
গত ৪ জুলাই ২০২৬ এবং তারপর বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম (টিভি, পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ডিজিটাল মিডিয়া) আপনার উদ্ধৃতি দিয়ে একটি অসত্য, ভূয়া, বানোয়াট, জাল জালিয়াতির সংবাদ প্রচার করেছে, উক্ত সংবাদে আপনি দাবি করেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি ৩ জন ( আমি রিয়াজুল রিজু, বদিউল আলম খোকন, মনজুরুল ইসলাম মেঘ) স্বনামধন্য পরিচালককে আজীবন বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি গত ৪ জুলাই ২০২৬ তারিখ।
আপনার দাবি অসত্য, গত ৪ জুলাই হতে অদ্য ১৯ জুলাই ২০২৬, গত ১৫ দিনেও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি এই বিষয়ে আমাকে কোন বহিষ্কারাদেশের অফিসিয়াল নোটিশ প্রদান করেনি, এতেই প্রমাণিত হয় যে, আপনার দাবি অসত্য। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তির শাস্তি হলে অতিদ্রুত সময়ে তাকে বিষয়টি অবগত করা হয়, কিন্তু ১৫ দিনেও এই বিষয়টি আমাকে অফিসিয়াল ভাবে কেউ অবগত করেনি, আমি কোন নোটিশ পাইনি, পত্রিকায় কোন বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি, যাহা সম্পূর্ণ বে-আইনি।
গত ৪ জুলাইয়ের আগেও আমাকে কোন কারণ দর্শানো হয়নি, আমাকে কেন আজীবন বহিষ্কার করা হবে সেই বিষয়ে কোন চিঠি বা ইমেইল কেউ করেনি। আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে না দিয়ে কেউ আমার সুনামহানী করতে পারেনা। এছাড়াও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির বিতর্কিত নির্বাচন এবং নির্বাচন উত্তরকার্যক্রমে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে, আদালত কর্তৃক বৈধতা না পাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কেউ গ্রহণ করতে পারে না।
(১) এহেন অবস্থায়, আমি (রিয়াজুল রিজু) উপমহাদেশের সর্বকনিষ্ঠ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার এবং জুলাই আন্দোলনের আহত গেজেটভুত্ত আহত জুলাই যোদ্ধা। আমার সুনামহানি করে আপনি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। আপনার দাবির পক্ষে আইনত কি কি ডকুমেন্টে আছে, তা আগামি ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আমাকে অবগত না করলে, আপনার বিরুদ্ধে ১০০ (এক শত) কোটি টাকার মানহানি মামলা করতে বাধ্য থাকিবো, যথাযথ আদালতে প্রচলিত আইনুযায়ী।
(২) এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির বর্তমান কমিটির বৈধতার বিরুদ্ধে আদালতে কয়েকটি মামলা বিচারাধীন। আপনি বর্তমান এই কমিটির একজন সদস্য দাবিদার, আপনার এবং আপনার কমিটির বিরুদ্ধে, আপনাদের কমিটির বৈধতার বিষয়ে যেখানে আদালতে মামলা চলমান, যখন আপনাদের কমিটিই আদালত কর্তৃক বৈধ প্রমাণিত হয়নি, সেহেতু আদালতের আদেশ অমান্য করে আপনারা এই ধরনের একটি বহিষ্কারাদেশ দিয়ে কেন আদালত অবমাননা বা রাষ্ট্রদোহিতা করেননি, সেই কারণ ৪৮ ঘন্টার মধ্যে লিখিত ভাবে আমাকে জানাবেন।
তাছাড়াও, আপনি বা আপনাদের বিরুদ্ধে কেনো বিজ্ঞ আদালত অবমাননা এবং আদালতের বিরুদ্ধে অশ্রদ্ধা (আপনাদের বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় আমাদের বহিস্কার করে সুনামহানী বিনষ্ঠ করার) করার কারণে আপনার/আপনাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা, রাষ্ট্রদোহিতা এবং মানহানীর মামলা করতে পারবনা, সেই কারণের জবাব আগামি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে না দিলে আপনার/আপনাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকিবো।
(৩) আপনার অসত্য কোটেশনে সংবাদ প্রকাশের আগে আমাকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির পক্ষ থেকে কোন নোটিশ দেওয়া হয়নি, আমাকে কেনো বহিস্কার করা হবে, সেই ব্যাখা বা কারণ কেউ চায়নি, যদিও এই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সমিতির একটি আইনত বৈধ কমিটি থাকা প্রয়োজন, সেই বৈধ কমিটি বর্তমানে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নেই, সেহেতু আমাকে বা আমাদের আজীবন বহিস্কারাদেশ দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই। কোনো সংগঠন কেবল তখনই তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে একশন (আদেশ) নিতে পারে যখন একটি আইনত বৈধ কমিটি থাকে, বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন কোন কমিটি অন্য কাউকে বাদ বা বহিস্কার করতে পারেনা।
মাননীয় আদালতে বিচারাধীন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির একটি অবৈধ কমিটি অনিয়ম ও জালিয়াতি পন্থায়, তাদের নিজস্ব কোরামের কিছু সদস্যকে সাথে নিয়ে অধিকাংশ সদস্যদের অবহিত না করে তথাকথিত একটি সাধারণ সভা করে যদি আমার/আমাদের সদস্য পদ আজীবন বহিষ্কারাদেশ দেয়, সেই সাধারণ সভা কেনো অবৈধ হবেনা? লিখিত ভাবে জানাবেন।
আপনি পরিচালক সমিতির বর্তমান অবৈধ ও প্রশ্নবিদ্ধ কমিটির একজন সদস্য, ঐ অবৈধ সাধারণ সভায় (যেহেতু বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান, এখনো আদালতের রায়ে বর্তমান কমিটি বৈধতা পায়নি) যারা উপস্থিত ছিল, তারা কেনো আদালত অবমাননা করেনি এবং তাদের বিরুদ্ধে কেনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবোনা, সেই কারণ আগামি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লিখিত ভাবে জানাবেন।
অন্যথায় আমি আমি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে বাধ্য হইব।
এই ব্যাপারে গাজী মাহবুবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়ে কথা বলতে পারব না। আমাদের রানিং মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল। তিনি ভালো বলতে পারবেন, আমি তো ইসি মেম্বার । আমি খুব ভালো করে বলতে পারব না। আপনি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
এ বিষয়ে জানতে শাহীন কবির টুটুলের ব্যবহৃত নাম্বারে কল দিলে নাম্বারটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'জিডি করা হয়েছে বিষয়টি আমার জানা নেই।'
বহিষ্কার করা তিন পরিচালকের অভিযোগ, বহিষ্কারের বিষয়টি তাদের অফিসিয়ালি জানানো হয়নি। কেন বর্তমান কমিটির এ সিদ্ধান্ত তাদের জানানো হয়নি? বিষয়টি নিয়ে সভাপতি বলেন, 'সংগঠনের সকল সদস্যের রায়ে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারা (তিন পরিচালক) সংগঠনের নিয়ম বহির্ভুত কাজ করেছে তাই। এটি সারাদেশ জানে, পত্র পত্রিকায় সংবাদও হয়েছে। এ ব্যাপারে তাদের আলাদা করে জানানোর কিছু নেই। সংগঠন তার নিয়মেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সেও (রিয়াজুল রিজু) দেশের নাগরিক তাই সে আইনী ব্যবস্থা নিতেই পারে। এটাও তার অধিকার।'
উল্লেখ্য, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক মহাসচিব শাহীন সুমন জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ৩ আগস্ট ২০২৪ তারিখে বিএফডিসিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে মানববন্ধন করায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নির্বাচনে বিতর্ক উঠে এবং এই কারণে গত বছর পরিচালক সমিতির নির্বাচন কয়েকবার স্থগিত হয়। পরবর্তীতে অনেকটা তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেসময় নির্বাচিত নেতারা সমিতিতে বসার চেষ্টা করলে, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক মহাসচিব বদিউল আলম খোকন আদালতে মামলা করে পরিচালক সমিতির সকল সদস্যদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চেষ্টা করে। আদালতে মামলা চলমান থাকা অবস্থায়, শাহীন সুমন-শাহীন কবির টুটুল নেতৃত্বাধীন কমিটি আদলতের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং অগঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বহিষ্কার করেছে অভিযোগ উঠেছে।