মো. লিখন হোসেন
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ০২:১৭ পিএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

মায়ের জন্য আজও নীরবে কাঁদে হৃদয়

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

মা দিবস এলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে ওঠে মায়ের সঙ্গে তোলা ছবিতে, ভালোবাসার স্ট্যাটাসে, কৃতজ্ঞতার কথায়। কেউ মাকে ফুল দেয়, কেউ উপহার, কেউবা সময় কাটায় মায়ের পাশে বসে।

কিন্তু পৃথিবীতে এমনও অসংখ্য মানুষ আছে, যাদের কাছে মা দিবস মানেই একরাশ নীরবতা, বুকভরা শূন্যতা আর স্মৃতির গভীর দীর্ঘশ্বাস। যাদের মা আর বেঁচে নেই, তাদের কাছে এই দিনটি আনন্দের নয়, বরং সবচেয়ে আবেগময় একটি দিন।

মা হারানোর কষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর শূন্যতাগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে মানুষ অনেক কষ্ট ভুলে যেতে পারে, কিন্তু মায়ের অনুপস্থিতি কখনো পুরোনো হয় না। বরং বছর যত যায়, মাকে আরও বেশি মনে পড়ে। বিশেষ করে মা দিবস এলে সেই স্মৃতিগুলো যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ ৯ বছর আগে মা চলে গেছেন। সময়ের হিসেবে হয়তো অনেকটা পথ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর সেই অভাব আজও প্রথম দিনের মতোই তীব্র। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মনে হয়— ‘মা থাকলে হয়তো আজ সবকিছু অন্যরকম হতো।’

মা ছিলেন সংসারের সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা। ছোটোবেলায় অসুস্থ হলে কপালে হাত রেখে রাত জেগে থাকা মানুষটি, পরীক্ষার আগে দোয়া করে দেওয়া মানুষটি, কষ্ট লুকিয়ে হাসিমুখে সন্তানের জন্য লড়াই করা মানুষটি— তিনি আর নেই। অথচ পৃথিবীর ব্যস্ততা থেমে থাকে না। মানুষ বড় হয়, দায়িত্ব বাড়ে, জীবন এগিয়ে যায়; শুধু মায়ের শূন্য জায়গাটা কোনোদিন পূরণ হয় না।

অনেকেই বলেন, সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়। কিন্তু মা হারানোর ক্ষেত্রে কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। সময় হয়তো মানুষকে বাঁচতে শেখায়, কিন্তু ভুলতে শেখায় না। বরং জীবনের প্রতিটি ধাপে নতুন করে বোঝা যায়, মা কত বড় আশীর্বাদ ছিলেন।

মা বেঁচে থাকলে হয়তো প্রতিদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করতেন— খেয়েছ? হয়তো ক্লান্ত মুখ দেখেই বুঝে যেতেন ভেতরের কষ্ট। হয়তো ব্যর্থতার দিনগুলোতে সাহস দিতেন। এখন চারপাশে অনেক মানুষ থাকলেও সেই একটি মানুষ নেই, যার কাছে নির্দ্বিধায় সবকিছু বলা যেত।

মা চলে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি বদলে যায় একটি ঘরের পরিবেশ। যে ঘরে মায়ের কণ্ঠ ছিল, সেখানে নেমে আসে অন্যরকম নীরবতা। ঈদ, জন্মদিন, পারিবারিক আয়োজন কিংবা বিশেষ কোনো দিন— সবকিছুতেই কোথাও না কোথাও একটা অপূর্ণতা থেকে যায়। মা দিবস এলে সেই অপূর্ণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

আজকাল অনেকেই মা দিবসকে কেবল আনুষ্ঠানিকতা মনে করেন। কিন্তু যারা মা হারিয়েছেন, তারা জানেন— একজন মা না থাকার বাস্তবতা কতটা কঠিন। পৃথিবীতে হাজারো সম্পর্ক তৈরি হয়, ভেঙে যায়, বদলে যায়; কিন্তু মায়ের সম্পর্কটাই একমাত্র, যেখানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কোনো ঘাটতি থাকে না।

মায়ের একটি পুরোনো শাড়ি, একটি ছবি, কিংবা কোনো স্মৃতি— সবকিছুই তখন অমূল্য হয়ে ওঠে। অনেক সময় হঠাৎ কোনো পরিচিত গন্ধ, কোনো পুরোনো গান কিংবা রান্নার স্বাদ মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে হয়, মা যেন খুব কাছেই আছেন, শুধু ছুঁয়ে দেখা যায় না।

মা হারানোর পর মানুষ সবচেয়ে বেশি বুঝতে শেখে দায়িত্বের ওজন। কারণ মা জীবিত থাকলে সন্তানের মাথার ওপর এক অদৃশ্য নিরাপত্তা থাকে। মা না থাকলে পৃথিবীটা হঠাৎ করেই অনেক কঠিন মনে হয়।

তবুও মানুষ বেঁচে থাকে স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে। মায়ের শেখানো কথা, আদর্শ, দোয়া আর ভালোবাসাই তখন পথ চলার সাহস হয়ে দাঁড়ায়। একজন মা হয়তো শারীরিকভাবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান, কিন্তু তার ভালোবাসা কখনো মরে না। সেটি সন্তানের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকে।

মা দিবসে যারা মায়ের সঙ্গে ছবি পোস্ট করেন, তাদের দেখে খারাপ লাগে না; বরং মনে হয়, পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুক। কারণ মা থাকা সত্যিই বড় সৌভাগ্যের বিষয়। যাদের মা বেঁচে আছেন, তারা হয়তো অনেক সময় বুঝতে পারেন না— এই মানুষটিই জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কিন্তু যখন মা থাকেন না, তখন বোঝা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গাটি আসলে মায়ের কাছেই ছিল।

বর্তমান সময়ে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, অনেক মা অবহেলার শিকার হচ্ছেন— এটি অত্যন্ত কষ্টের বাস্তবতা। যে মা নিজের জীবন উৎসর্গ করে সন্তানকে বড় করেছেন, তার শেষ বয়সে একটু ভালোবাসা আর যত্নই তো সবচেয়ে বেশি প্রাপ্য। মা দিবস শুধু উদযাপনের দিন নয়, এটি আমাদের দায়িত্ব ও মানবিকতার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলামে মায়ের প্রতি সম্মানকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।’ এই কথার গভীরতা তখন আরও বেশি অনুভব হয়, যখন মা পৃথিবীতে আর থাকেন না।

মা হারানো মানুষদের জীবনে একটি অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়— তারা প্রায়ই আকাশের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। মনে মনে বলে, ‘মা, তুমি কেমন আছো?’ হয়তো কোনো উত্তর আসে না, তবুও হৃদয়ের ভেতর এক ধরনের অনুভূতি কাজ করে— মা কোথাও থেকে ঠিকই দেখছেন।

দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে গেছে। পৃথিবী অনেক বদলেছে, জীবনও বদলেছে। কিন্তু একটি জায়গা আজও একই রয়ে গেছে —মায়ের জন্য বুকের ভেতরের সেই শূন্যতা। সময় হয়তো ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, কিন্তু মায়ের স্মৃতিকে বদলাতে পারে না।

মা দিবস তাই শুধু আনন্দের দিন নয়; এটি স্মৃতির দিন, ভালোবাসার দিন, কৃতজ্ঞতার দিন এবং হারিয়ে ফেলা মানুষদের নীরবে মনে করার দিন। যারা মা হারিয়েছেন, তারা জানেন— একজন মা চলে গেলেও তার ভালোবাসা কখনো পৃথিবী ছেড়ে যায় না।

মা দিবসে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আর যেসব মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের জন্য রইল নিঃশব্দ দোয়া। কারণ একজন মা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যান না; তিনি সন্তানের স্মৃতি, প্রার্থনা আর ভালোবাসার ভেতর আজীবন বেঁচে থাকেন।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। দৈনিক কালবেলার সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পর্তুগালকে সমতায় ফেরালেন রোনালদো

অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়লেন রোনালদো

ইউক্রেনে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত ২৭

ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া, বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার

ইতালিতে ট্রিপল মার্ডারের একমাত্র সাক্ষী আমিরের জবানবন্দি

শেষ ষোলোর টিকিট কেটে যে রেকর্ড গড়ল স্পেন

সাঁতার শিখতে গিয়ে প্রাণ গেল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের

অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন

শ্রমিক নেতাকে হত্যা, ছাত্রদলের ২ নেতা বহিষ্কার

নরওয়ে ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে বড় সুসংবাদ

১০

বিএনপি নেতার মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল

১১

কেন বাতিল হলো কুকুরেয়ার গোল?

১২

মুক্তিপণের আদায়ে অপহরণ, পুলিশের অভিযানে বাঁচল যুবক

১৩

পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ কে জিতবে, জানাল সুপার কম্পিউটার

১৪

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে গেল স্পেন

১৫

আশুলিয়ায় ডিবির অভিযানে গাঁজাসহ ২ মাদককারবারি গ্রেপ্তার

১৬

কলাবাগানে নিয়ে মাকে হত্যা, ঘাতক ছেলে গ্রেপ্তার

১৭

স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান: বাল্যবিয়ের বিষ-ছোবলে লাখো ছাত্রী

১৮

আনোয়ার ইস্পাতের আয়োজনে বুয়েটে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ

১৯

স্থানীয় সরকারে ভোট দিতে ভোটার হওয়ার শেষ সময় ৩১ জুলাই

২০
X