

ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে—এমন অভিযোগ তুলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আকস্মিকভাবে শতাধিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালায়। এই অতর্কিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক নেতৃবৃন্দ নিহত হন। তবে নেতৃত্বের এমন আকস্মিক শূন্যতা ও প্রাথমিক শোক কাটিয়ে উঠে ইরান পরাশক্তির বিরুদ্ধে অভাবনীয় এক পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। তারা দ্রুততম সময়ে প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সামরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি ইরান তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত চাল হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ‘চোক পয়েন্ট’ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ ভাগ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতিতে যুদ্ধের ভয়াবহ আঁচ লাগতে শুরু করে।
পরাশক্তিগুলোর এই সামরিক উন্মাদনা শুধু যে ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনীতিকে স্থবির করে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিল তা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদন ইঞ্জিনখ্যাত পুরো এশিয়াকে ঠেলে দিল এক দীর্ঘমেয়াদি মন্দা ও মূল্যস্ফীতির অন্ধকারে। আর সেই সর্বনাশা ঢেউয়ের নির্মম আঘাতে এশিয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রবাসী আয়, রপ্তানি খাত এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন আজ এক চরম ও শ্বাসরুদ্ধকর অস্তিত্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে এই ভূ-অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়েছে এশিয়া। এশিয়ার দেশগুলো মূলত বিশ্বের উৎপাদন ইঞ্জিন, আর এই ইঞ্জিন সচল রাখার প্রধান জ্বালানি আসে পারস্য উপসাগর থেকে। জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) উন্নয়নশীল এশিয়ার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪.৭ শতাংশে নামিয়েছে এবং আঞ্চলিক মূল্যস্ফীতি ৫.২ শতাংশে উন্নীত করেছে। এশিয়ার এই ক্ষতির মূল কারণ হলো তাদের চরম জ্বালানি-নির্ভরতা এবং বিকল্প শক্তির অভাব। জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো বাধ্য হয়ে পরিবেশের ক্ষতি জেনেও কয়লার মতো দূষণকারী জ্বালানির দিকে ফিরে গেছে। তেলের চড়া দাম ও কারখানার উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে পুরো এশিয়া জুড়েই সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দা।
চলমান এই বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার অন্যতম নির্মম শিকার বাংলাদেশ। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি প্রবাসী আয় এবং তৈরি পোশাক রপ্তানি; দুটোই এখন গভীর সংকটে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পরবর্তী চার মাসে (ফেব্রুয়ারি-জুন ২০২৬) মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহ পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পায়। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অচলাবস্থা, বীমা মাশুল এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে দেশে যে তীব্র ‘আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি’ তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলে ছাড়ছে। বিগত কয়েক বছরের রপ্তানি উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। করোনা-পরবর্তী সময়ে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানি ৪৬ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড ছুঁয়েছিল। কিন্তু বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন এবং পশ্চিমা বিশ্বের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সেই প্রবৃদ্ধির ধারা এখন স্পষ্টতই নিম্নমুখী। বিজিএমইএ-এর তথ্যমতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে যেখানে পোশাক রপ্তানি ছিল ৩৬.৫৬ বিলিয়ন ডলার, সেখানে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে পশ্চিমা বিশ্বে অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে তা ৩.৪১ শতাংশ কমে ৩৫.৩১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক। এই সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশকে এখন অত্যন্ত দ্রুত ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক কৌশলের দিকে হাঁটতে হবে।
প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তার আমূল সংস্কার করতে হবে। খোলা বাজার থেকে চড়া দামে এলএনজি কেনার আত্মঘাতী নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে বিকল্প বাজার অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে। ব্রুনেই দারুসসালাম এবং মালয়েশিয়া হতে পারে এলএনজি আমদানির নির্ভরযোগ্য বিকল্প; দূরত্ব কম হওয়ায় জ্বালানি পরিবহনে ফ্রেইট চার্জও সাশ্রয়ী হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি ডিজেল এবং কেীশলগত ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে জলবিদ্যুৎ আমদানি হতে পারে অন্যতম টেকসই সমাধান। ভারতের এই ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার পেছনে মূল সমীকরণটি হলো তাদের বিশাল বাণিজ্যিক লাভ এবং কর্পোরেট বিনিয়োগ সুরক্ষা। নেপাল ও ভুটানের মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে জিএমআর (GMR) বা এসজেভিএন (SJVN)-এর মতো ভারতীয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। উৎপাদিত এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য তাদের একটি বৃহৎ ও নির্ভরযোগ্য বাজার প্রয়োজন; ফলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা তাদের সেই বাণিজ্যিক মুনাফা ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে রাশিয়া বর্তমানে ডিসকাউন্টেড মূল্যে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করছে। ‘Currency Swap’ বা নিজস্ব মুদ্রায় বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে রাশিয়া থেকে সস্তায় জ্বালানি আমদানি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনবে। যেকোনো আকস্মিক বৈশ্বিক সংকটে জনদুর্ভোগ এড়াতে সীমিত পরিসরে হলেও নিজস্ব কৌশলগত মজুত (Strategic Reserve) কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একইসাথে হরমুজ প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ রুটে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সরাসরি ইরানের সাথে অত্যন্ত সক্রিয় বাণিজ্যিক কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিমা বাজারের ওপর একক নির্ভরতা কাটিয়ে বিকল্প বাজার ধরতে বাংলাদেশকে ‘লুক ইস্ট’ নীতির মাধ্যমে চীন, জাপান, ভারত এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে হবে। হোম টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ এবং আইটি খাতের প্রসারে ল্যাটিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) স্বাক্ষর করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পশ্চিমা অবরোধ বা ডলার সংকটের ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু) শক্তিশালী করার পাশাপাশি বন্ধু দেশগুলোর সাথে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য সহজীকরণে ব্রিকস (BRICS) ও বিমস্টেকের মতো জোটগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে।
তৃতীয়ত, বৈশ্বিক স্ট্যাগফ্লেশনের (অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি) বিরূপ পরিস্থিতিতে কেবল তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা আমাদের অর্থনীতির জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এই সংকট মোকাবিলায় রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সুরক্ষায় সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া জরুরি। নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার লক্ষ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও আধুনিকায়ন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের (SME) দ্রুত প্রসার এবং কঠোর বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের নাগালে রাখার মতো সুনির্দিষ্ট ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি, যুদ্ধকালীন এই কঠিন সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমাদের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের নিরাপত্তা ও জীবিকার সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলো বরাবরের মতোই তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা ও নিবিড় তত্ত্বাবধান অব্যাহত রাখবে বলে আমরা আশাবাদী।
পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক চুক্তি কখনোই চিরস্থায়ী নয়, বরং তা পুনরায় সংঘাতের আগে একটি কৌশলগত বিরতি মাত্র। মার্কিন-ইরানের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতির সুযোগে ‘কোলেটারাল ড্যামেজ’ এড়াতে বাংলাদেশকে দ্রুত ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখাতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির সুরক্ষা মানে কেবল জিডিপির কাগুজে পরিসংখ্যান নয়; এর প্রকৃত অর্থ কারখানার চাকা সচল রাখা, প্রবাসীর শ্রমের নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। তাই পরাশক্তির ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও আধিপত্যের লড়াই থেকে দেশকে সুরক্ষিত রাখতে হলে পরমুখাপেক্ষিতার বৃত্ত ভেঙে একটি স্বনির্ভর ও প্রতিরক্ষামূলক অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণের মোক্ষম সময় এখনই।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা; পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।