

পপুলিস্ট ইস্যু (জনতুষ্টিবাদী বা গণতুষ্টিবাদী ইস্যু) বলতে এমন রাজনৈতিক বিষয় বা প্রতিশ্রুতিকে বোঝায়, যা তাত্ত্বিক বা দীর্ঘমেয়াদী জটিলতার চেয়ে সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক আবেগ, ক্ষোভ এবং ইচ্ছা পূরণের ওপর বেশি জোর দেয়। সাধারণত ‘সাধারণ মানুষ’ বনাম ‘সুবিধাবাদী এলিট/অভিজাত শ্রেণি’-এই বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে এই ইস্যুগুলো তৈরি করা হয়। পপুলিস্ট ইস্যুর মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা (Anti-establishment) ও সরলীকরণ।
প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা নীতি-নির্ধারকদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করা করা এবং অত্যন্ত জটিল অর্থনৈতিক বা সামাজিক সমস্যার খুব সহজ এবং চমকপ্রদ সমাধান প্রস্তাব করা হচ্ছে জনতুষ্টিবাদের মূল বৈশিষ্ট্য। পপুলিজম বা জনতুষ্টিবাদ অনেক সময় গণতন্ত্রের স্বার্থে সাধারণ মানুষের দাবি সামনে আনতে সাহায্য করলেও, এটি প্রায়ই বাস্তবসম্মত সমাধানের বদলে আবেগনির্ভর নীতি প্রণয়নে বাধ্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি বা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বাংলাদেশে সাধারণত পপুলিজমের বিরুদ্ধে তেমন কাউকে কখনো দাঁড়াতে দেখি না। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন, হুমায়ুন আজাদ, আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসকে আমরা পপুলিজমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেখেছি। হয়তো আরও কেউ কেউ থাকতে পারেন এই কাতারে। হাল আমলে ব্রাত্য রাইসুকে দেখতে পাই। মূলত বুদ্ধিজীবীর মূল কাজই হচ্ছে পপুলিজমের বিরুদ্ধে প্রকৃত সত্য জনসমক্ষে নিয়ে আসা। ক্রিটিক্যালি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে হাল সময়ের রাজনৈতিক পপকর্ন ইস্যু হচ্ছে ‘মীর শাহে আলম’। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার বর্তমানে এই ইস্যুতে বেশ নাস্তানাবুদ। ইস্যুটির ব্যাপক সরলীকরণ হচ্ছে। পপুলিজমের সূত্র ধরে সাধারণ মানুষ তা খাচ্ছেও। অবশ্য সাধারণ মানুষের এতে দোষ নেই কোন। মীর শাহে আলমের নামকরণ ইস্যুটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ত্বরিত নির্দেশে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিতর্ক অবসানে প্রধানমন্ত্রীর সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিতর্ক কেন এখনো থামছে না তা খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি।
বিতর্কটি উসকে দিতে আজকের দৈনিক ইনকিলাবের প্রধান শিরোনাম, ‘শাহে আলমে তোলপাড়’ শীর্ষক প্রতিবেদন করেছে। প্রতিবেদনে, ‘রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও টিভি ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার বলেছেন, ‘ভারত ‘রাম রাজ্য’ কায়েম করছে আর এখানে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ‘নাম রাজ্য’ কায়েম করছে। উনি ছেলের নামে, ভাইয়ের নামে, মেয়ের নামে, ভাতিজির নামে, বংশের নামে ইউনিয়নগুলোর নাম দিচ্ছেন এবং সেখানে বরাদ্দ নিয়ে এসেছে সবচেয়ে বেশি। তারেক রহমানের বন্ধু ভাগ্য খুব খারাপ। এর আগে একজন ছিল গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। আর এখন হচ্ছেন মীর শাহে আলম। এই বন্ধুর কারণে নাকি বড় বড় মন্ত্রী তার সামনে কথা বলে না।’
তুষার ঘটনার নৈর্ব্যক্তিক ও ক্রিটিক্যাল বিশ্লেষণ না করে জনতুষ্টিবাদের পক্ষে মতামত দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে চেয়েছেন। অথচ এই সেদিনও বিএনপির ভিতরে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা সমালোচনা সত্ত্বেও বিএনপি উদারতা দেখিয়ে তাকে অতিথি ও আলোচক করে অনুষ্ঠান করেছে। তুষারেরা এরকমই। তারা মওকা বুঝে চলে। ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারা’ এদের মজ্জাগত। বিএনপির নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই তুষার গোত্রের সুশীল সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর হাছানাত আলী তার একটি লেখায় লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসমর্থিত ও প্রমাণবিহীন প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ হিসেবে উপস্থাপনের যে প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা বাস্তবতা ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারেক রহমানের শিক্ষা ও রাজনৈতিক বিকাশ ঘটেছে ঢাকা কেন্দ্রিক পরিবেশে। অন্যদিকে মীর শাহে আলমের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। উপরন্তু, তাদের বয়সের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। ফলে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সুস্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন। বগুড়ার মানুষ হিসেবে আমরা জানি যে তারেক রহমান জাতীয় পর্যায়ের নেতা, আর মীর শাহে আলম জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় দায়িত্ব পালনকারী একজন রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠক। সেই বিবেচনায় তাদের সম্পর্ককে নেতা-কর্মীর সম্পর্ক হিসেবে দেখাই অধিকতর বাস্তবসম্মত।’
সম্প্রতি জুলকারনাইন সায়ের তার একটি ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, ‘প্রশ্ন হলো, যেখানে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ১ জুন নিজেই সংশ্লিষ্ট সচিবকে চিঠি দিয়ে তার বা তার পরিবারের নামে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামকরণের ‘অপতৎপরতা’ বন্ধ করতে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, সেখানে ৯ জুন (৮ দিন পর) ঠিক কোন বিবেচনায় ওই সচিবের অধীনস্থ সহকারী সচিব ঠিক উল্টো কাজটি করলেন? এই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ, আর তাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের ঘটনা স্টেইজ করে কোন বিশেষ মহল কি পক্ষান্তরে সরকারকেই বিব্রত করতে চাইছে? সাম্প্রতিক সময়ে এই এক ব্যক্তিকে ঘিরে নানা রকম সমালোচনা ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি বিষয় যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা উচিত — তাহলে বেশ পরিষ্কার হওয়া যাবে এই চিঠির মতো অন্যান্য ঘটনা সমূহে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সম্পৃক্ততা কতটুকু, নাকি কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।’
হাছানাত আলীও একই সন্দেহ পোষণ করেছেন। তিনি তার লেখায় বলেছেন ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং পেশাগত মানদণ্ড অনুসরণ করাও সমানভাবে জরুরি। জনপরিসরে প্রচারিত যেকোনো তথ্যের ক্ষেত্রে সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক ও বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব হবে। রাষ্ট্র, সরকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বার্থে তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতা এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চাই হওয়া উচিত আমাদের সবার প্রত্যাশা।’
সরকার দ্রুত বিষয়টি খতিয়ে দেখে এবিষয়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিবে বলে আমরা মনে করি। সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রচারণা কৌশলের মাধ্যমে এই ইস্যুটি নিয়ে দুরভিসন্ধিমূলক নানান অপচেষ্টা নিরসন হবে বলে আমরা মনে করি।
লেখক : রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী