

একসময় চ্যানেল আইয়ের জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতা ‘সেরাকণ্ঠ’-এর চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ। এবার তিনি আলোচনায় ভিন্ন এক অর্জনে। ৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি।
মেধাতালিকায় দেশের প্রথম ৫০ জনের মধ্যে স্থান করে নিয়ে সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশ পেয়েছেন এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টের মাধ্যমে সুখবরটি জানান মুগ্ধ। তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। ৪৭তম বিসিএস। প্রশাসন (Admin) ক্যাডার। মেধাক্রমে দেশের প্রথম ৫০-এ স্থান করে নিয়ে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পদে সুপারিশপ্রাপ্তির সুসংবাদ জানাই সবাইকে।’
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘শত দায়িত্বের চাপ, সহস্র সংশয়, দোটানা। তারপরও অজস্র প্রশ্নোত্তরের খোঁজে ৪৭: সমুদ্র পাড়ি দেওয়া বান্দার শ্রমের প্রতিদান যিনি দিয়েছেন, সেই মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশার প্রতি নিজের ভালোবাসার কথাও তুলে ধরেন মুগ্ধ। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে যে ভীষণ আত্মতৃপ্তি ছিল, আজকের বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ারেও সেই চেনা সুখের মূল্য কমে যায়নি।’ একই সঙ্গে বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত অন্যদের অভিনন্দন জানিয়ে ক্যাডার-প্রত্যাশীদের জন্য শুভকামনা এবং সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন তিনি।
মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ বর্তমানে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। ২০১৯ সাল থেকে তিনি শিক্ষকতা করে আসছেন। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও বিসিএস প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়ে তিনি এ সাফল্য অর্জন করেছেন।
মুগ্ধর সাফল্যের পথচলা অনেক আগে থেকেই শুরু। স্কুলজীবনে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন করেন তিনি। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রকৌশল শিক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
সংগীতের পাশাপাশি গণিতেও ছিল তার সমান দক্ষতা। ২০১২ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত ৫৩তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে ‘অনারেবল মেনশন’ অর্জন করেন তিনি। এছাড়া জাতীয় গণিত অলিম্পিয়াডে ছয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার বিরল কৃতিত্ব রয়েছে তার।
২০১০ সালে চ্যানেল আই সেরাকণ্ঠ প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে সারা দেশে পরিচিতি পান মুগ্ধ। তবে তার প্রতিভা শুধু সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা, চিত্রাঙ্কন, বিজ্ঞান, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একের পর এক পুরস্কার অর্জন করেন। বুয়েটে ভর্তি হওয়ার আগেই তার ঝুলিতে ছিল ২৯টি জাতীয় পুরস্কার। খেলাধুলাতেও সমান পারদর্শী ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালে আন্তঃস্কুল টেবিল টেনিস ও বাস্কেটবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
ময়মনসিংহের চড়পাড়ায় জন্ম নেওয়া মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধর বাবা ইসকান্দর মির্জা একজন কলেজশিক্ষক এবং মা তাহমিনা বেগম স্বাস্থ্য পরিদর্শক। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় এবং তার একজন যমজ ভাইও রয়েছেন।
গান, গণিত, লেখাপড়া, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও নেতৃত্ব—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের সক্ষমতার স্বাক্ষর রাখা মির্জা তানজিম শরীফ মুগ্ধ এবার যোগ করতে যাচ্ছেন নতুন পরিচয়। সেরাকণ্ঠের মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া তার আলোচিত যাত্রা এখন প্রশাসন ক্যাডারের দায়িত্বশীল ভূমিকায় নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।