শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:০১ পিএম
আপডেট : ০২ জুলাই ২০২৬, ০২:০৩ পিএম
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন, সে পথেই গবেষক আজম খান

তরুণ গবেষক এমডি আজম খান
তরুণ গবেষক এমডি আজম খান

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে পরিমাপ করা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা, সঞ্চালন লাইন, মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা এবং কতটি পরিবার বিদ্যুতের আওতায় এসেছে—এসব সূচকের মাধ্যমে। সেই অগ্রগতির গুরুত্ব আজও অপরিসীম। তবে আগামী দিনের বাস্তবতা আরও ভিন্ন। এখন প্রয়োজন এমন বুদ্ধিমান প্রযুক্তি, যা বিদ্যুতের চাহিদা পূর্বাভাস দিতে পারবে, যন্ত্রপাতির ত্রুটি আগেভাগে শনাক্ত করবে, শক্তির অপচয় কমাবে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে বড় ধরনের ঝুঁকির আগেই সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করবে।

এই নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের তরুণ গবেষক এমডি আজম খান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিক্স, শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়ন এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা করে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। তার দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো— এআইভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, অস্বাভাবিকতা শনাক্তকরণ (অ্যানোমালি ডিটেকশন), প্রেডিকটিভ মেইনটেন্যান্স এবং সিদ্ধান্ত-সহায়ক প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে শক্তির অপচয় কমানো ও জ্বালানি ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

বাংলাদেশের জন্য এই গবেষণার গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। গত এক দশকে দেশটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিদ্যুৎপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০০৯ সালে যেখানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫ হাজার মেগাওয়াটেরও কম, সেখানে ২০২৫ সালে তা ৩০ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯৯ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের চাহিদা এখনো বাড়ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনো সীমিত, আর স্মার্ট গ্রিড ও আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এখন জাতীয় অগ্রাধিকার। অর্থাৎ, বাংলাদেশ শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে; এখন সেই ভিত্তিকে আরও বুদ্ধিমান করে তোলার সময়।

এমডি আজম খানের গবেষণা ঠিক এই প্রয়োজনীয়তার দিকেই ইঙ্গিত করে। তার উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘A Physics-Guided Bayesian Neural Network for Sensor Fault Detection in Wind Turbines’। আইইইই ওপেন জার্নাল অব দ্য কম্পিউটার সোসাইটি-তে প্রকাশিত এই গবেষণায় তিনি পদার্থবিজ্ঞানভিত্তিক মডেল এবং বেয়েসিয়ান নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বায়ু টারবাইনের সেন্সরের ত্রুটি শনাক্ত করার একটি উন্নত এআই পদ্ধতি উপস্থাপন করেছেন। গবেষণায় ব্যবহৃত মডেলটি বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে ৯৭.৬ শতাংশ নির্ভুলতা (অ্যাকিউরেসি), ৯১.৮ শতাংশ রিকল এবং ০.৯৮৭ এইউসি-আরওসি অর্জন করেছে। পাশাপাশি ব্যাখ্যাযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে গিয়ারবক্সের তাপমাত্রা, ব্লেডের কম্পন এবং জেনারেটরের টর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ত্রুটির কারণও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই গবেষণার লক্ষ্য হলো বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগেই প্রকৌশলীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যতের জন্য এ ধরনের গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারের নবায়নযোগ্য শক্তি নীতি ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বায়ু টারবাইন, শিল্প কারখানা এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন ডেটাভিত্তিক পূর্বাভাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা—যে ক্ষেত্রেই এমডি আজম খানের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

একটি গবেষণাপত্রের মধ্যেই তার কাজ সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তার গবেষণা স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক স্বীকৃতি পুরস্কারে (গবেষণার বিভাগ) তিনি সম্মানিত হয়েছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই সাপ্লাই চেইন, পরিবেশগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনকল্যাণমূলক এআই গবেষণায় অবদানের জন্য। এই পুরস্কারের নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক; প্রতিবছর প্রায় ১৫ হাজার আবেদনকারীর মধ্য থেকে মাত্র ৫.৮ শতাংশকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সম্মান তার গবেষণার বৈজ্ঞানিক মান এবং বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বহন করে।

তার গুগল স্কলার প্রোফাইল অনুযায়ী বর্তমানে তার গবেষণাকর্ম ৩০৭টি উদ্ধৃতি অর্জন করেছে। তার এইচ-ইনডেক্স ১২ এবং আই১০-সূচক ১৫। গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে তথ্যব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মেশিন লার্নিং উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া তার ১৫টিরও বেশি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা প্রবন্ধ, আইইইই সদস্যপদ, অর্কিড গবেষক পরিচিতি এবং এআই সমন্বিত ডেটা প্রসেসিং ও সাপ্লাই চেইন প্রযুক্তি-সংক্রান্ত একটি পেটেন্ট রয়েছে। গবেষণা জগতে এসব সূচক একজন গবেষকের কাজের গ্রহণযোগ্যতা, প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সম্প্রদায়ে তার অবদানের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়।

জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তার গবেষণা উল্লেখযোগ্য। ‘Optimizing Energy Consumption Patterns in Southern California: An AI-Driven Approach to Sustainable Resource Management’ শীর্ষক গবেষণায় তিনি আবাসিক, বাণিজ্যিক এবং শিল্প খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শক্তি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন কৌশল উপস্থাপন করেছেন। বাংলাদেশের গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম কিংবা সাভারের মতো শিল্পাঞ্চলের জন্যও এ ধরনের গবেষণা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ উন্নত পূর্বাভাস প্রযুক্তি শিল্পকারখানায় শক্তির অপচয় কমাতে, উৎপাদন পরিকল্পনা আরও কার্যকর করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

এমডি আজম খানের গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গবেষণা ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করা। তার কাজের মধ্যে রয়েছে মেশিন লার্নিং, পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ, ডেটা ড্যাশবোর্ড, ডেটা পাইপলাইন, প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিক্স এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য সিদ্ধান্ত-সহায়ক প্রযুক্তি উন্নয়ন। ভবিষ্যৎ গবেষণায় তিনি সমন্বিত ডেটা সিস্টেম, প্রেডিকটিভ মেইনটেন্যান্স, কার্বন-সচেতন এআই এবং শক্তি-দক্ষ ডিজিটাল অবকাঠামো—বিশেষ করে ডেটা সেন্টারের জ্বালানি দক্ষতা—নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন। কারণ এআই শুধু জ্বালানি সমস্যার সমাধানই নয়; এআই নিজেও একটি বড় জ্বালানি ব্যবহারকারী প্রযুক্তি। তাই ভবিষ্যতের এআইকে আরও শক্তি-দক্ষ করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমডি আজম খানের গবেষণাকে শুধু একজন প্রবাসী বাংলাদেশি গবেষকের ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার কাজ দেশের জ্বালানি রূপান্তর, শিল্প আধুনিকায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন ভাবনার দিকনির্দেশনা দেয়। একসময় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের প্রধান প্রশ্ন ছিল—কীভাবে আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আগামী দিনের প্রশ্ন হলো—কীভাবে প্রতিটি ইউনিট বিদ্যুৎকে আরও বুদ্ধিমান, দক্ষ, নির্ভরযোগ্য এবং টেকসই করে তোলা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রেডিকটিভ অ্যানালিটিক্সভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমডি আজম খান সেই ভবিষ্যতের পথ নির্মাণে অবদান রাখছেন, যা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে আরও আধুনিক ও টেকসই করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া, বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার

ইতালিতে ট্রিপল মার্ডারের একমাত্র সাক্ষী আমিরের জবানবন্দি

শেষ ষোলোর টিকিট কেটে যে রেকর্ড গড়ল স্পেন

সাঁতার শিখতে গিয়ে প্রাণ গেল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রের

অস্ট্রিয়াকে উড়িয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন

শ্রমিক নেতাকে হত্যা, ছাত্রদলের ২ নেতা বহিষ্কার

নরওয়ে ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে বড় সুসংবাদ

বিএনপি নেতার মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল

কেন বাতিল হলো কুকুরেয়ার গোল?

মুক্তিপণের আদায়ে অপহরণ, পুলিশের অভিযানে বাঁচল যুবক

১০

পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ কে জিতবে, জানাল সুপার কম্পিউটার

১১

অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে গেল স্পেন

১২

আশুলিয়ায় ডিবির অভিযানে গাঁজাসহ ২ মাদককারবারি গ্রেপ্তার

১৩

কলাবাগানে নিয়ে মাকে হত্যা, ঘাতক ছেলে গ্রেপ্তার

১৪

স্বপ্নভঙ্গের খতিয়ান: বাল্যবিয়ের বিষ-ছোবলে লাখো ছাত্রী

১৫

আনোয়ার ইস্পাতের আয়োজনে বুয়েটে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ

১৬

স্থানীয় সরকারে ভোট দিতে ভোটার হওয়ার শেষ সময় ৩১ জুলাই

১৭

শাশুড়িকে হত্যার পর গোপনে দাফন, পুত্রবধূর স্বীকারোক্তিতে রহস্য ফাঁস

১৮

বিদ্যুৎস্পর্শে প্রাণ গেল ২ ভাইয়ের

১৯

সকাল ৯টার মধ্যে ঝড় হতে পারে যেসব অঞ্চলে

২০
X