

অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান) হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশের একটি আঞ্চলিক জোট। এর সদস্য দেশগুলো হলো—ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং সদ্য যুক্ত হওয়া পূর্ব তিমুর।
১৯৬৭ সালে স্নায়ুযুদ্ধের সময় আসিয়ান গঠিত হয়। প্রথমদিকে এ জোটের উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করা। তবে গত ৫০ বছরে এটি আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নভিত্তিক এক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
আসিয়ানকে একক সত্তা ধরা হলে এটি হবে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি। অন্য বৃহত্তম অর্থনীতির দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানি। বর্তমানে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৬৮ কোটি ৮০ লাখের বেশি এবং তাদের সম্মিলিত জিডিপি প্রায় ৩ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার (মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী)। এ বছর আসিয়ানের একাদশ সদস্য হিসেবে পূর্ব তিমুরকে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশটি ২০০২ সালে ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং বর্তমানে এর জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ।
সম্মেলনে কারা অংশ নিচ্ছেন: এবারের আসিয়ান সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ, জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাকসন।
রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন উপপ্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার নোভাক এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অংশ নিচ্ছেন ভার্চুয়ালি। এ ছাড়া ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও কুয়ালালামপুরে উপস্থিত থাকছেন।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ফিফার প্রতিনিধিরাও কিছু বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বারনামা।
সম্মেলনে কী কী ঘটবে: মূল আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক হবে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর, যা অনুষ্ঠিত হয় রোববার সকালে। এ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। গত জুলাইয়ে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। মালয়েশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পাঁচ দিন পর যুদ্ধবিরতি হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই শান্তিচুক্তি বাস্তব সমাধানের চেয়ে ট্রাম্পের ‘সাফল্য প্রদর্শন’-এর সুযোগ হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
কম্বোডিয়ার বিরোধীদলীয় নেত্রী মু সুচুয়া আলজাজিরাকে বলেন, এই চুক্তি শান্তির জন্য নয়, বরং বাণিজ্য সুবিধার বিনিময়ে চাপ প্রয়োগের মতো। অনেকেই একে অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল বলছেন।
কী আলোচনা হবে: সম্মেলনে আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্কনীতি, চীনের বিরল খনিজ রপ্তানি সীমিতকরণ, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দ্রুত বেড়ে চলা সাইবার প্রতারণা কেন্দ্রগুলো। এ বিরল খনিজগুলো আধুনিক প্রযুক্তিপণ্যে অপরিহার্য আর এর উৎপাদনে চীন একচেটিয়া অবস্থান দখল করে আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলতি বছরের এপ্রিলে ‘লিবারেশন ডে ট্যারিফস’ নামে নতুন শুল্কনীতি চালু করেন, যার ফলে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ওপর ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
আসিয়ানবিষয়ক বিশ্লেষক মার্কো ফস্টার জানান, প্রায় সবাই ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ চাইবে। সবাই চেষ্টা করবে কোনোভাবে তার সঙ্গে বা তার দলের কারও সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে। এ বৈঠকগুলো থেকে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তথ্যসূত্র: আলজাজিরা