

‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত মোহাম্মদ হামদান দাগোলো গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সুদানের রাজনৈতিক মঞ্চে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার নেতৃত্বাধীন আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এখন দেশের অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করছে। এ মিলিশিয়া বাহিনী সম্প্রতি দারফুরের পশ্চিমাঞ্চলে একটি বিজয় অর্জন করেছে। তারা দেশটির সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় মিত্রদের দখলে থাকা শেষ গ্যারিসন এল-ফাশার শহর দখল করেছে। সেখানে ওই মিলিশিয়া বাহিনীর গণহত্যার খবর বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশের পর হেমেদতিকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একসময় তার পরিচয় ছিল উট ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী হিসেবে, আজ তিনি সুদানের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক। ২০১৩ সালে হেমেদতি আনুষ্ঠানিকভাবে আরএসএফের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তার উত্থান শুরু হয়। শত্রুদের কাছে হেমেদতি এক আতঙ্কের নাম হলেও, তার অনুসারীরা তাকে দেখে দৃঢ়তা, কঠোরতা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে ফেলার প্রতিশ্রুতির প্রতীক হিসেবে।
হেমেদতির জন্ম ১৯৭৪ বা ১৯৭৫ সালে দারফুরের এক যাযাবর পরিবারে। তার পরিবার মহারিয়া শাখার রিজেইগাত সম্প্রদায়ের, যারা ঐতিহ্যগতভাবে উট পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে। দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা হেমেদতি কৈশোরেই স্কুল ছেড়ে উট বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন, লিবিয়া ও মিশরের মরুভূমি পাড়ি দিয়ে পণ্য বেচাকেনা করতেন। সে সময় দারফুর ছিল এক অবহেলিত, দরিদ্র ও বিশৃঙ্খল অঞ্চল, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির সরকারের নজর এড়িয়ে ছিল। এ প্রেক্ষাপটে দারফুরে শুরু হয় জাতিগত সংঘাত। ২০০৩ সালে ফুর জাতিগোষ্ঠী বিদ্রোহ শুরু করলে, বশির সরকার আরব মিলিশিয়া বাহিনী ‘জানজাওয়িদ’কে বিদ্রোহ দমনে পাঠায়। হেমেদতিও তার একটি ইউনিটের নেতৃত্ব দেন। একসময় তিনি পরিচিতি পান শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনীর প্রধান, এক করপোরেট সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রক এবং প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ হিসেবে।
এরপর দারফুরের সবচেয়ে বড় স্বর্ণখনি ‘জাবেল আমিরে’র নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘আল-গুনেইদ’কে সুদানের বৃহত্তম স্বর্ণ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। আরএসএফ শুধু দারফুরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সুদানের সেনা পাঠানোর অনুরোধ করলে হেমেদতি সুযোগটি কাজে লাগান। তিনি সৌদি আরব ও ইউএইর সঙ্গে পৃথক চুক্তি করে তার বাহিনীর সদস্যদের ভাড়াটে সেনা হিসেবে পাঠাতে শুরু করেন। বিশেষ করে আবুধাবির সঙ্গে এ সম্পর্ক তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০১৯ সালে বশির সরকারের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ তীব্র হলে, বশির হেমেদতির ইউনিটগুলোকে রাজধানী খার্তুমে মোতায়েনের নির্দেশ দেন। তবে সেনাপ্রধানদের বৈঠকে হেমেদতিসহ অন্য কমান্ডাররা তাকে ক্ষমতাচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেন।
অল্পদিনের মধ্যেই হেমেদতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক পরিষদের যুগ্মপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান বেসামরিক প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত করতে থাকেন। তবে এ জোট স্থায়ী হয়নি। অল্পদিনের মধ্যেই বুরহান আরএসএফকে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনার দাবি জানালে হেমেদতি তাতে রাজি হননি। বিশ্লেষকদের ধারণা, হেমেদতির এখন দুটি সম্ভাব্য লক্ষ্য রয়েছে—তিনি হয়তো নিজেকে একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বা পুরো সুদানের শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, তিনি নিজেকে এমন এক সর্বশক্তিমান ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখতে চান, যিনি ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য, ভাড়াটে বাহিনী এবং রাজনৈতিক দল—এ তিনেরই নিয়ন্ত্রণ রাখবেন।