

দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি নাটকীয় গতিতে জোরদার হচ্ছে। এরই মধ্যে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী জেরাল্ড ফোর্ড লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। মঙ্গলবার মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে ওই রণতরী মোতায়েনের নির্দেশ দেন।
জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে আটটি যুদ্ধজাহাজ, একটি পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন ডুবোজাহাজ এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ক্যারিবীয় অঞ্চলে পৌঁছেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন পর্যন্ত ক্যারিবীয় সাগরে ও লাতিন আমেরিকার প্রশান্ত মহাসাগর উপকূলে মাদক বহন করছে সন্দেহে অন্তত ১৯টি নৌযানে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ৭৬ জন নিহত হয়েছেন।
এরই মধ্যে ভেনেজুয়েলায় স্থল অভিযান চালানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, সমুদ্রের পর এবার ভূমি হবে পরবর্তী লক্ষ্য। এমন প্রেক্ষাপটে যে কোনো ধরনের আগ্রাসন বা সামরিক হামলা ঠেকাতে সশস্ত্র বাহিনীকে প্রস্তুত রাখার ঘোষণা দিয়েছে ভেনেজুয়েলার সরকার। পাশাপাশি তারা গেরিলা যুদ্ধেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জেরাল্ড ফোর্ড নিয়ে রয়টার্স বলছে, ২০১৭ সালে কমিশন পাওয়া এটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি। এখানে পাঁচ হাজারের বেশি নাবিক কর্মরত। সংবাদসংস্থাটিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, তাদের রণতরি মোতায়েনের লক্ষ্য মাদক পাচার প্রতিহত করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রগুলো দুর্বল ও ধ্বংস করা।
অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর অভিযোগ, লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এ সামরিক প্রস্তুতির লক্ষ্য তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। ওয়াশিংটনের
অভিযোগ, মাদুরোর সঙ্গে মাদক পাচার ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। মাদুরো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রথম রণতরি মোতায়েনের ঘোষণা করে, তখন মাদুরো সতর্ক করে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র কখনো তার দেশে হস্তক্ষেপ করে, তবে রাইফেল হাতে লাখ লাখ নারী-পুরুষ দেশজুড়ে মিছিল করবেন। যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করতে ভেনেজুয়েলাও অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করেছে—রয়টার্স এমন কিছু নথিপত্র দেখেছে। সেখানে দেখা গেছে, ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার তৈরি কয়েক দশকের পুরোনো অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র আকাশ বা স্থলপথে অভিযান চালায়, তবে গেরিলা কায়দায় তা মোকাবিলার পরিকল্পনা করেছে তারা।
শুধু ভেনেজুয়েলা নয়, প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বাড়ছে। ট্রাম্প ও কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো একে অপরের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
আলজাজিরা বলছে, মঙ্গলবার দেওয়া বিবৃতিতে ভেনেজুয়েলা সরকারের যেসব প্রস্তুতির কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে আছে স্থল, আকাশপথ, নৌপথে সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা বাহিনীকে ব্যাপকভাবে মোতায়েন করা। পাশাপাশি পুলিশ, মিলিশিয়া ও সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে গঠিত বাহিনীগুলোও মোতায়েন থাকবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের দীর্ঘদিনের শত্রু নিকোলা মাদুরো সরকারকে উৎখাত করতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরবর্তী ধাপে স্থল হামলাও চালানো হতে পারে। তবে অক্টোবরের শেষ দিকে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি ভেনেজুয়েলার ভেতরে হামলার কথা ভাবছেন কি না। তখন ট্রাম্প উত্তরে বলেছিলেন, ‘না’। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলায় কোনো সামরিক হামলা চালানো হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউগভের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষ ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে স্থল হামলার বিরোধিতা করেছেন। মাত্র ১৯ শতাংশের মতো মানুষ বলেছেন, তারা এমন হামলাকে সমর্থন করবেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সরকারের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে প্রায় ২৮০টি স্থানে ছোট ছোট ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে তারা যে কোনো সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নাশকতা ও গেরিলা কৌশল ব্যবহার করতে পারবে।