সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বিশ্ববেলা ডেস্ক 8
প্রকাশ : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:৩৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ট্রাম্প কেন পুতিনকে থামাতে পারছেন না

বিবিসির বিশ্লেষণ
ট্রাম্প কেন পুতিনকে থামাতে পারছেন না

ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ ও ‘পুতিনের সঙ্গে শান্তি স্থাপন’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে; কিন্তু যুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া শান্তি প্রস্তাবের বদলে হুমকি দেওয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত কূটনীতিতে ট্রাম্পের বাজি এখনো কেন কাজ করেনি, তা বিশ্লেষণ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় দ্রুত উত্তেজনা বেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল কোম্পানি রসনেফট ও লুক অয়েলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, অন্যদিকে ক্রেমলিন পরীক্ষা করেছে তাদের নতুন পারমাণবিক শক্তি চালিত বুরেভেস্টনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং পোসাইডন আন্ডারওয়াটার ড্রোন।

উভয় দেশই বলেছে, তারা পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করতে পারে। উভয় দেশ যে কেবল হুমকি দিচ্ছে এমন না, বরং স্থলভাগেও যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। বছরের শুরুতে সম্পর্ক উন্নতির সম্ভাবনা থাকলেও এখন পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে।

ভালো কথা হয়; কিন্তু কাজ এগোয় না

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে কিছুটা অগ্রগতির আংশিক ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর প্রথমবার ওয়াশিংটন ও মস্কো সরাসরি আলোচনা করে। দুই প্রেসিডেন্ট নিয়মিত ফোনে কথা বলেন এবং গত আগস্টে আলাস্কায় বৈঠক করেন। এ মুহূর্তে উভয় পক্ষের একমাত্র সাফল্য হলো যে, সংলাপ অন্তত চলছে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের ইউরোপ ও রাশিয়াবিষয়ক সাবেক সিনিয়র ডিরেক্টর অ্যান্ড্রু পিক বলেন, আমরা অন্তত শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলছি—এটাই বড় অগ্রগতি। অবস্থান তুলে ধরা, মতবিনিময় করা, এটাই কূটনীতির ভিত্তি।

বিশেষ দূত উইটকফ!

ট্রাম্প ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপরই বেশি ভরসা করেছেন। তিনি তার পুরোনো নিউইয়র্ক রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়িক ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্টিভ উইটকফকে বিশেষ দূত হিসেবে পুতিনের সঙ্গে দেখা করার জন্য বেশ কয়েকবার পাঠিয়েছেন। প্রতিটি সফরের পর দুই পক্ষই জানায়, তারা সমঝোতার কাছাকাছি চলে এসেছেন; কিন্তু পররাষ্ট্র নিয়ে যারা কাজ করেন, সেসব মহলে উইটকফের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্দেহ আছে।

ইউরোপের দুই কূটনীতিক বিবিসিকে জানান, উইটকফ প্রায়ই পুতিন ছাড় দেবেন–এমন ধারণা ভুল ধরে নিয়ে মস্কো যেতেন; কিন্তু পরে হোয়াইট হাউস দেখতো বাস্তবতা তার উল্টো।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, ট্রাম্প ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও বাণিজ্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেন; কিন্তু পুতিন তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইউক্রেনের আত্মসমর্পণ ও পুরো ডনবাসের নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন এবং একটি ‘ঐতিহাসিক বক্তৃতা’ দেন, যা ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করে, বলে ওই রিপোর্টে উল্লেখ আছে। ইউরোপের এক কূটনীতিক বিবিসিকে বলেন, ‘আমেরিকানরা আলাস্কায় অগ্রগতির ঘাটতি দেখে সত্যিই হতাশ হয়েছিল।’ আরেকজন বলেন, তারা ভুল বুঝেছিল— রাশিয়ার জন্য যুদ্ধ আসলে কী অর্থ বহন করে।

বাইডেন প্রশাসনের সময়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক রাশিয়ান উপদেষ্টা এরিক গ্রিন বলেন, ‘সম্ভাব্য ছাড় ও বিনিময় নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছিল। অঞ্চল ছাড়াও নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিষয় ছিল, আর ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু মানুষ বুঝতে পারেনি, পুতিন যুদ্ধের মূল কারণ বলতে কী বোঝাচ্ছেন।

ট্রাম্প নিজেও হতাশ হয়েছিলেন দাবি করে অক্টোবরের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার সময় তিনি বলেন, প্রতিবার পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করি, ভালো কথা হয়; কিন্তু কিছুই অগ্রগতি হয় না।

পুতিন আসলে কী চান?

মস্কোতে রাশিয়ার সরকারি অবস্থান সাম্প্রতিক মাসগুলোয় খুব একটা বদলায়নি। যুদ্ধ শেষ করতে পুতিনের শর্তগুলো হলো: পাঁচটি ইউক্রেনীয় অঞ্চলে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি, ইউক্রেনের নিরপেক্ষ অবস্থান, ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী কমানো; রুশ ভাষার সাংবিধানিক সুরক্ষা; পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

রাশিয়া বলছে, একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক চুক্তির পরই যুদ্ধ থামবে। ওয়াশিংটন ও কিয়েভের কাছে এটি অগ্রহণযোগ্য। তাদের মতে, আগে যুদ্ধবিরতি হতে হবে।

অ্যান্ড্রু পিক বলেন, অগ্রগতি করতে হলে তিন বিষয়ে সমঝোতা জরুরি— ভূখণ্ড, ইউক্রেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। তার মতে, এসব বিষয়গুলোর কোনোটিতেই প্রায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

ট্রাম্প শুরুতে ভূখণ্ডের বিষয়ে আপসের ক্ষেত্রে নমনীয় ছিলেন। এপ্রিলেই তিনি বলেন, ‘ক্রাইমিয়া রাশিয়ার মতোই থাকবে। এবং তার দল ২০১৪ সালে এ অঞ্চলের অধিগ্রহণের স্বীকৃতির সম্ভাবনাও পরখ করেছিল বলে মিডিয়া রিপোর্টে উল্লেখ আছে। অক্টোবরে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকেও ট্রাম্প ‘অঞ্চল বিনিময়’ প্রস্তাব তোলেন বলে রয়টার্স জানায়।

রাশিয়াও কিছুটা নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, দক্ষিণ ইউক্রেনের বর্তমান ফ্রন্টলাইন ধরে মস্কো হয়তো সমঝোতা করতে পারে। তবে তিনি এটাও বলেন, রাশিয়া এখনো খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ডনবাস অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চায়, যেখানে তারা আংশিক হামলা করেছে।

ইউরোপের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ট্রাম্প তার ব্যবসায়িক মানসিকতায় ‘রিয়েল এস্টেট ডিল’ চেয়েছিলেন। কিন্তু পুতিনের কাছে বিষয়টি শুধু ভূখণ্ডের বিষয় নয়—এটা ইউক্রেনের ওপর সার্বভৌমত্বের বিষয়।

অর্থাৎ কিয়েভের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সামরিক সক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ। মস্কো যথাযথ ‘নিরপেক্ষতা’ এবং ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর ব্যাপক হ্রাস চায়।

‘সময় কেনা’

এই শরতে বুদাপেস্টে শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা অচলাবস্থাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ফোনালাপের পর ট্রাম্প ও পুতিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভকে প্রস্তুতির দায়িত্ব দেন। তারা একবার কথা বলেছিলেন; কিন্তু কোনো বৈঠক হয়নি। ব্লুমবার্গ জানায়, রুবিও বুঝতে পারছেন মস্কোর অবস্থান বদলায়নি।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, রাশিয়া আবারও তাদের দাবিগুলো পুনরাবৃত্তি করে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়েছে, যা মার্কিন কর্মকর্তাদের আরও হতাশ করেছে।

গত ১২ নভেম্বর রুবিও বলেন, ‘আমরা কেবল বৈঠকের জন্য বৈঠক চালিয়ে যেতে পারি না।’ পরদিন ল্যাভরভ বলেন, রাশিয়া আলোচনায় অনিচ্ছুক—এ অভিযোগ ‘স্পষ্ট মিথ্যা’। তিনি বলেন, মস্কো দ্বিতীয় ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের জন্য প্রস্তুত, যদি তা ‘আলাস্কা শীর্ষ সম্মেলনের সুপরিকল্পিত ফলাফলের’ ওপর ভিত্তি করে হয়।

এদিকে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করতে বেশ জোরেশোরেই চেষ্টা চালিয়েছে। শুরুতে ট্রাম্প সরাসরি পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইছিলেন কিয়েভকে পাশ কাটিয়ে, যা ইউক্রেন ও ইউরোপকে উদ্বিগ্ন করে। এরপর ট্রাম্প ইউক্রেন বিষয়ে স্বর নরম করেন।

রাশিয়ার বিপরীতে, ইউক্রেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে নমনীয় থেকেছে, যুদ্ধবিরতি ও মস্কোর সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার মার্কিন প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। কিয়েভ এবং তার মিত্রদের জন্য, লক্ষ্য ছিল সহজ— ট্রাম্পকে বোঝানো যে, পুতিনের কাছে আত্মসমর্পণ ইউরোপীয় এবং মার্কিন নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক বিবিসিকে বলেছেন, ‘আমরা জানতাম যে তিনি অবশেষে বুঝতে পারবেন রাশিয়া সৎ বিশ্বাসে আলোচনা করছে না। আমাদের কাজ ছিল সময় কেনা এবং এটি কাজ করেছে।

মস্কো অবশ্য ইউরোপকে দোষারোপ করছে। ল্যাভরভ বলেন, ‘ইউরোপীয়রা ঘুমোচ্ছে না, তারা এ প্রশাসনকে চাপ দিচ্ছে।’

আলাস্কা সামিটের তিন মাস পরও ক্রেমলিন ও হোয়াইট হাউস কোনো সমঝোতার কাছাকাছি নেই। অক্টোবরে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে প্রথম বড় নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়, রাশিয়ার বৃহৎ তেল কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বিবিসি পার্টনার সিবিএসকে বলেন, ‘আমরা যা করছি সবই পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আনবে।’ পুতিন নিষেধাজ্ঞাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাশিয়া চাপের মুখে নীতি বদলাবে না। এর কিছুদিন পরই মস্কো একটি পারমাণবিক সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, যা ইঙ্গিত দেয় আলোচনা নয়, বরং নতুন করে শক্তির প্রদর্শন চলছে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দেশের যেসব জেলায় ভূমিকম্প অনুভূত, উৎপত্তিস্থল যেখানে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত

খেলতে গিয়ে প্রাণ গেল দুই শিশুর

চা শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের দাবিতে ইউএনওর কাছে স্মারকলিপি

আরও বাড়ল ই-ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়

লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে আবারও যুদ্ধে নামব : ইরান

‘বিশ্ব এলপিজি দিবস-২০২৬’ উদযাপন করল ফ্রেশ এলপি গ্যাস

আর্জেন্টিনা যেন মিনি হাসপাতাল!

বিশ্বকাপ এলেই রং বদলান নেইমার

রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়লেন জামায়াত আমির

১০

সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে নতুন সমীকরণ, আলোচনায় নাসিম ফারুক খান মিঠু

১১

বিশ্বকাপে সেদিন আবির্ভাব হয়েছিল এক ‘ফুটবল দেবতার’, নাম তার ম্যারাডোনা

১২

লাশ নিয়ে থানা ঘেরাও, এস আই প্রত্যাহার

১৩

বাজেট ২০২৬-২৭ / মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা

১৪

সেই তিন ভাইয়ের অ্যাকাউন্টে জমা হলো ১২ লাখ টাকা

১৫

চমেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা, ইনডোর ও আউটডোর শাটডাউনের হুঁশিয়ারি

১৬

এনসিপির ফল উৎসবে হামলা

১৭

সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে

১৮

মেহেদী অনুষ্ঠানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান, কারাগারে দুই যুবক

১৯

বিএমডিসির নিবন্ধনবিহীন চিকিৎসকের পক্ষে মানববন্ধন, মামলা প্রত্যাহারের দাবি

২০
X