বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:২৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৬ সালে কি শেষ হবে ইউক্রেন যুদ্ধ

সংঘাতের ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য পথরেখা
২০২৬ সালে কি শেষ হবে ইউক্রেন যুদ্ধ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত হিসেবে পরিচিত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে রয়েছে। ২০২৫ সালের শেষপ্রান্তে এসে যখন কিয়েভের সেন্ট সোফিয়া চত্বরে ক্রিসমাস ট্রি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, তখন ইউক্রেনীয়দের মনে একটাই প্রশ্ন—২০২৬ সাল কি শান্তির বার্তা নিয়ে আসবে, নাকি এটি শুধু এক দীর্ঘতর যুদ্ধের নতুন এক অধ্যায় হবে?

পূর্ণ পরিণতির আশা নেই: ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা ভাসিলি, যিনি যুদ্ধে একটি পা হারিয়েছেন, তার অভিজ্ঞতা থেকে জানান যে, ইউক্রেনীয় সেনাদের প্রতি রুশ বাহিনীর মনে আতঙ্ক থাকলেও শক্তির ভারসাম্য এখনো রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে আছে। যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি এখন সাহসিকতা নয়, বরং শিল্প উৎপাদন এবং গোলাবারুদের সরবরাহ। ভাসিলি বলেন, ‘আমরা যখন রেডিওতে শত্রুর ট্যাংকের অবস্থান জানাই, তখন অনেক সময়ই উত্তর আসে—অপেক্ষা করো, আমাদের কাছে মারার মতো শেল নেই।’

ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনবল এবং অস্ত্রের ঘাটতি। রাশিয়ার অর্থনীতি এখন যুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের সামরিক বাজেট এবং জনবল ইউক্রেনের তুলনায় অনেক বেশি। ইউক্রেন তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রের প্রায় ৪০ শতাংশ এখন অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন করছে, যা যুদ্ধের শুরুতে মাত্র ১৫-২০ শতাংশ ছিল। বাকি ৬০ শতাংশের জন্য তারা পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৬ সালে এই যুদ্ধের মোড় কোন দিকে ঘুরবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই সামরিক সহায়তার ধারাবাহিকতার ওপর।

শান্তি নাকি সাময়িক বিরতি: ইউক্রেনের সাবেক ডেপুটি চিফ অব জেনারেল স্টাফ ইহোর রোমানেনকোর মতে, রাশিয়ার মতো আক্রমণাত্মক প্রতিবেশী থাকলে যুদ্ধের ‘পূর্ণ সমাপ্তি’ আশা করাটা হয়তো অবাস্তব। ২০২৬ সালে আমরা বড়জোর একটি সামরিক বিরতি বা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি দেখতে পারি। রোমানেনকো মনে করেন, ১৯৯১ সালের সীমান্ত পুনরুদ্ধার না করা পর্যন্ত ইউক্রেনের পক্ষে কোনো চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিতে সই করা অসম্ভব।

যদি কোনো কারণে যুদ্ধবিরতি হয়ও, তবে রাশিয়া যে ভবিষ্যতে আবার আক্রমণ করবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই ইউক্রেনকে একটি ‘দুর্গ রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে হবে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে এবং ঘরোয়া অস্ত্র উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়াতে হবে।

রাজনৈতিক সমীকরণ ও হোয়াইট হাউসের ভূমিকা: ২০২৬ সালের যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে কিয়েভ বা মস্কোর চেয়ে ওয়াশিংটনের ভূমিকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য নীতি বা মার্কিন প্রশাসনের চাপের মুখে ইউক্রেনকে হয়তো অত্যন্ত কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকোর মতে, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ভাগে একটি ‘সুযোগের জানালা’ তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য শর্ত হলো—রাশিয়াকে বুঝতে হবে যে, তারা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ভেঙে দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে না। যদি রণক্ষেত্রে একটি অচলাবস্থা তৈরি হয়, শুধু তখনই পুতিন আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হতে পারেন। তবে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছতে এবং উভয়পক্ষের দাবিগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে কয়েক মাস বা বছর লেগে যেতে পারে।

একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব এমন হতে পারে যে, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক অঞ্চলের কিছু অংশ ছাড়তে হতে পারে, যার বিনিময়ে রাশিয়া উত্তর ও পূর্বের অন্য কয়েকটি এলাকা থেকে সেনা সরিয়ে নেবে। যদি এমন কোনো আপস না হয়, তবে যুদ্ধ সহজেই ২০২৭ বা তার পরবর্তী সময় পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ কী: বিশ্লেষক ইহোর তিশকেভিচ আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতার অভাব এবং বৈশ্বিক মেরূকরণের কথা মাথায় রেখে ইউক্রেনের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন—

ফিনল্যান্ড মডেল (১৯৩৯): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিনল্যান্ড সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বাধীনতার বিনিময়ে তাদের ১০ শতাংশ ভূমি মস্কোর হাতে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। ইউক্রেনের জন্য এটি হবে অত্যন্ত বেদনাদায়ক একটি বাস্তবতা।

জর্জিয়া মডেল (২০০৮): এ মডেলে ইউক্রেন তার হারানো ভূখণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকার করবে না; কিন্তু সেখানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং ‘ফ্রোজেন কনফ্লিক্ট’ হিসেবে এটি চলতে থাকবে।

অন্তর্বর্তীকালীন মডেল: যেখানে যুদ্ধ থমকে যাবে, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত সমাধান হবে না। দুই দেশই সীমান্তের ওপার থেকে একে অপরের ওপর নজরদারি চালাবে এবং মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো সংঘর্ষ চলবে।

মস্কোর সক্ষমতা ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার অসারতা: জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন মনে করেন, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো যথেষ্ট কার্যকর হয়নি। অনেক দেশ এখনো রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ক্রেমলিনের যুদ্ধ তহবিল এখনো শক্তিশালী। মিত্রোখিনের মতে, রাশিয়ার কাছে আরও অন্তত দুই বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো রসদ রয়েছে।

অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় সরকারের ভেতরকার দুর্নীতি এবং জনবল সংগ্রহের ক্ষেত্রে শিথিলতা কিয়েভকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মিত্রোখিন মনে করেন, ২০২৬ সালে রাশিয়া যদি দোনেৎস্ক বা জাপোরিঝিয়ার বিশাল অংশ দখল করে নিতে সফল হয়, তবে ইউক্রেনকে বাধ্য হয়েই আলোচনার টেবিলে বসতে হবে।

সাধারণ মানুষের ক্লান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ: যুদ্ধের ময়দানের বাইরে সাধারণ ইউক্রেনীয়দের অবস্থা শোচনীয়। চার বছর ধরে চলা লাগাতার সাইরেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তীব্র শীতে বিদ্যুৎহীন জীবন মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কিয়েভের প্রবীণ অর্থনীতিবিদ তারাস তিমোশচুক বলেন, ‘মানুষ এখন শান্তি চায়। যদি দোনেৎস্ক ছেড়ে দিলে এই রক্তক্ষয় বন্ধ হয়, তবে সেটাই হোক। আমরা আমাদের সন্তানদের ড্রোন আর মিসাইলের শব্দের বদলে স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হতে দেখতে চাই।’

এই মানবিক ক্লান্তি ২০২৬ সালে সরকারের ওপর এক বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে একদিকে যেমন পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে দেশের মানুষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা দূর করতে হবে।

বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তন: ২০২৬ সালে বিশ্ব রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মার্কিন আধিপত্যের অবসান এবং চীন ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তির উত্থান এই যুদ্ধের ফলের ওপর প্রভাব ফেলবে। পশ্চিমা বিশ্ব যদি ইউক্রেনের ওপর থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়, তবে কিয়েভের জন্য টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। আবার রাশিয়া যদি মনে করে যে তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পশ্চিমকে ক্লান্ত করে দিতে পেরেছে, তবে পুতিন আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবেন।

সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এ বছরটি যুদ্ধের তীব্রতা কমে আসা বা একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির বছর হতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে এটি একটি ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উখিয়ায় পৃথক স্থান থেকে দুটি বার্মিজ অজগর উদ্ধার, পরে অবমুক্ত

বগুড়ায় প্রশিক্ষণ এলাকা পরিদর্শনে সেনাপ্রধান

মাদক রাখতে বাঁধা দেওয়ায় ৬ জনকে কুপিয়ে জখম, আটক ১

স্কুলছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে যুবকের ৬ মাসের কারাদণ্ড

টেকসই ব্যাংকিং নিশ্চিতে ট্রেড ফাইন্যান্সের আধুনিকায়ন অপরিহার্য: বিআইবিএম

মানহীন-ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যপণ্য / ডিএসসিসির মামলায় ৪ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ক‌্যানসার আক্রান্ত শিক্ষক সাজু বাঁচতে চান

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্বারে দ্বারে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হবে: প্রতিমন্ত্রী

৯৬ বছরের ইতিহাসে যা কোন দল পারেনি এবার কি তাই করে দেখাবে স্পেন?

শান্তিরক্ষা মিশনে জ্ঞান ও উদ্ভাবনী পদ্ধতির ওপর বিনিয়োগ বৃদ্ধির আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

১০

মেসিরা উঠলেই বদলে যাবে ফাইনালের রেফারি!

১১

বান্দরবানে বন্যার্তদের পাশে বিজিবি

১২

ফিফা থেকে রেকর্ড ‘পুরস্কার’ পাচ্ছে মিশর

১৩

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে নিহত সেনা সার্জেন্ট সেলিমের লাশ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন

১৪

শিশুর রহস্যজনক মৃত্যু, সন্দেহের তীর মা ও সৎ বাবার দিকে

১৫

নিষিদ্ধ সংগঠনের পোস্টার লাগানোর অভিযোগে মামলা, আসামি শতাধিক

১৬

এইচএসসিতে নকলের দায়ে ৭ পরীক্ষার্থী বহিষ্কার, ৫ শিক্ষককে অব্যাহতি

১৭

হলে ছাত্রদল নেতার সিট দখল ও মারধরের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন

১৮

টানা বর্ষণে পেকুয়ায় জনজীবন স্থবির, প্লাবিত অন্তত ২০ গ্রাম

১৯

বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা

২০
X