

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সংঘাত ছড়িয়েছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। আক্রমণ হয়েছে জ্বালানি স্থাপনা, সার উৎপাদন কেন্দ্রসহ সরবরাহ শৃঙ্খলে। বিশেষ করে বেশি আক্রান্ত হয়েছে সার উৎপাদনকারী উপসাগরীয় অঞ্চল। আর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার কৃষকদের জীবনে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় সার উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপালের কৃষকরা সারের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়ছেন। অনেক কৃষক খরচ কমাতে সার কম ব্যবহার করছেন, যা ফসল উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। এতে আয় কমবে এবং খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সরকারগুলো সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করছে, বিকল্প উৎস খুঁজছে এবং কখনো প্রাকৃতিক সার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। তবু মাঠ পর্যায়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কৃষকদের জন্য এ সংকট শুধু বৈশ্বিক রাজনীতি নয়, বরং তাদের পরিবারের খরচ, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বপন মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু সার সংকট এবং দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। ভারতের পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার ৪২ বছর বয়সী কৃষক রমেশ কুমার এ বছর তার ফসল নিয়ে খুবই চিন্তিত। তিনি নিজের গমের ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে হিসাব করছেন—সারের খরচ, সম্ভাব্য ফলন এবং বাজারে দাম নিয়ে।
কিন্তু তার চিন্তা শুধু ফসলেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, ঋণ শোধ এবং মেয়ের বিয়ের জন্য জমিয়ে রাখা টাকাও এখন তার মাথায় ঘুরছে। তিনি বলেন, ‘এ বছর হয়তো বিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। সব কিছুই ফসলের ওপর নির্ভর করছে।’ আগে সার সহজে পাওয়া যেত এবং দামও মোটামুটি স্থির ছিল; কিন্তু এখন সার পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে এবং দামও বেড়ে গেছে। এতে কৃষকদের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রমেশ বলেন, ‘দাম আরও বাড়লে আমাদের কোথাও না কোথাও কাটছাঁট করতে হবে। হয়তো বিয়ে পিছিয়ে দিতে হবে আর পরিস্থিতি খারাপ হলে সন্তানের পড়াশোনাও চালানো কঠিন হয়ে যাবে।’
দক্ষিণ এশিয়ার অনেক কৃষকের জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতি নয়, এটি সরাসরি তাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। এই সংকটের মূল কেন্দ্র হলো হরমুজ প্রণালি, যা ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
ইরানের ওপর হামলার পর এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। আর এই গ্যাস সার উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সরবরাহ কমে যায়, পরিবহন খরচ বাড়ে এবং সার আরও দামী হয়ে ওঠে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় ২০০ কোটি মানুষ বাস করে এবং এখানে কৃষি ব্যাপকভাবে সারের ওপর নির্ভরশীল। গম, ধানসহ প্রধান খাদ্য উৎপাদনে সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভারতে প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত, পাকিস্তানে প্রায় ৩৮ শতাংশ, বাংলাদেশে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং নেপালে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ এ খাতে কাজ করে।
ভারত তার প্রয়োজনীয় সারের একটি বড় অংশ আমদানি করে। এর মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ সরবরাহ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসে।
পাকিস্তানে কৃষি জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখে। সেখানে ২০-২৫ শতাংশ সার আমদানি এই পথ দিয়ে আসে। এ ছাড়া দেশে ইউরিয়া উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস প্রয়োজন, যার দামও এখন বাড়ছে। বাংলাদেশে কৃষি জিডিপির প্রায় ১২-১৩ শতাংশ। দেশের কৃষকরা ব্যাপকভাবে আমদানি করা সারের ওপর নির্ভরশীল, যার ২৫-৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।
নেপাল প্রায় পুরো সারই আমদানি করে এবং এর বড় অংশ ভারত হয়ে আসে, যা আবার উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারগুলো কৃষকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, পর্যাপ্ত সারের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বিকল্প উৎস খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে আস্থা কম।
কাশ্মীরের এক কৃষক গুলাম রাসুল বলেন, ‘যুদ্ধের খবর শুনলেই আগে দাম বেড়ে যায়। তখনই আমরা কম সার ব্যবহার শুরু করি।’ তিনি জানান, কম সার ব্যবহার করলে ফলন কমে যায়, কিন্তু অনেক সময় তাদের কোনো উপায় থাকে না।
পাকিস্তানের কৃষক মুনির আহমদ বলেন, ‘সারের দাম বাড়লে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের আগেই ঋণ ও খরচ আছে।’ বাংলাদেশের রংপুরের কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘কখনো সার পাওয়া যায়, কখনো পাওয়া যায় না। আর যখন পাওয়া যায়, তখন দাম বেশি থাকে।’ নেপালের কৃষক মেঘনাথ আরিয়াল আশঙ্কা করছেন, যদি সময়মতো সার না আসে, তাহলে ফসল কমে যাবে।
সরকারগুলো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ সরকার নতুন করে ইউরিয়া আমদানি করার পরিকল্পনা করেছে এবং চীন ও মরক্কো থেকে সার আনার চিন্তা করছে।
নেপাল সরকার কৃষকদের প্রাকৃতিক সার যেমন গোবর, কম্পোস্ট ইত্যাদি ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। তবে সমস্যা শুধু কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
সার কম ব্যবহার হলে ফসল উৎপাদন কমে যাবে। এতে খাদ্যের দাম বাড়বে। দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাবারের পেছনে খরচ করে, তাই এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারগুলো আগে ভর্তুকির মাধ্যমে সারের দাম কম রাখত। কিন্তু এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় সেই ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
রমেশ কুমার ইতোমধ্যেই কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি কম সার ব্যবহার করবেন, যদিও জানেন এতে ফলন কমে যাবে। তিনি বলেন, ‘এটি ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’ ফসল কম হলে আয় কম হবে এবং পরিবারে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘স্কুলের ফি তো দিতেই হবে, সংসারের খরচও থামবে না। আর মেয়ের বিয়ে… দেখা যাবে।’
শেষ পর্যন্ত, তাকে কিছু না কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও একই অবস্থা। কোথাও দাম নিয়ে উদ্বেগ, কোথাও সরবরাহ নিয়ে, কোথাও আবার দেরি নিয়ে। রমেশ কুমারের কথায়, ‘অন্যান্য মানুষের জন্য এটি যুদ্ধের বিষয়। কিন্তু আমাদের জন্য এটি পরিবারের খরচ চালানো যাবে কি না—সেই প্রশ্ন।’