বিশ্ববেলা ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি হলেও ধোঁয়াশা কাটেনি লেবানন-হরমুজ নিয়ে

১৪ দফার সমঝোতা স্মারক সই
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি হলেও ধোঁয়াশা কাটেনি লেবানন-হরমুজ নিয়ে

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘ বৈরিতা অবসানের লক্ষ্যে অবশেষে একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সুইজারল্যান্ডের নির্ধারিত অনুষ্ঠানের পরিবর্তে বুধবার ফ্রান্সের ভার্সাইয়ে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেন। একই দিনে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের কাছে এই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। অবশ্য এখনো চুক্তির কোনো ভৌত বা লিখিত অনুলিপি জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি এবং ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের দেওয়া এই অনুলিপিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেননি। তবে এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তিটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম স্পষ্ট পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি অমীমাংসিত নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে লেবাননে চলমান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।

লেবানন সম্পর্কে সমঝোতা স্মারকে যা আছে: সমঝোতা স্মারকের প্রথম দফায় লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ এবং দেশটির সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে চুক্তিতে ইসরায়েলের কোনো উল্লেখ নেই, যারা বর্তমানে লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা দখল করে রেখেছে এবং মার্চ থেকে চলা হামলায় অন্তত ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে।

যেহেতু চুক্তিটি কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হয়েছে এবং ইসরায়েল বা হিজবুল্লাহ এতে স্বাক্ষরকারী নয়, তাই এই যুদ্ধবিরতি কীভাবে কার্যকর হবে তা অস্পষ্ট। এ ছাড়া হিজবুল্লাহকে ইরানের অর্থায়ন বন্ধের বিষয়েও চুক্তিতে কিছু বলা হয়নি। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ স্পষ্ট জানিয়েছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় তারা লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবেন। মূলত লেবানন সংকট ছিল আলোচনার প্রধান বাধা। গত এপ্রিলে পাকিস্তানে দুই দেশের সরাসরি বৈঠকের আগে ইরানের স্পিকার গালিবাফ লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি এবং ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করাকে অপরিবর্তনশীল শর্ত হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। যদিও ১৬ এপ্রিল ট্রাম্প ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবুও ওয়াশিংটন ও তেহরান চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানোর পরও চলতি সপ্তাহে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত ছিল।

ইরানের শাসনভার পরিবর্তন সম্পর্কে যা আছে: সমঝোতা স্মারকের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষ পরস্পরের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করবে এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে। এটি ইঙ্গিত করে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরান সরকারের পতন বা শাসনভার পরিবর্তনের আশা ত্যাগ করেছে।

সম্প্রতি ট্রাম্প এই লক্ষ্য থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। চলতি সপ্তাহে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, তিনি কখনোই ইরানের ‘শাসনভার পরিবর্তন নিয়ে মাথা ঘামাননি’। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের ওপর আক্রমণের ফলেই সেখানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এসেছে—যদিও ব্যাপক হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের পরও ইরানের সরকার কাঠামো এখনো দৃঢ়ভাবে বহাল রয়েছে। অথচ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে প্রথম যৌথ হামলার সময় ট্রাম্প ইরানি জনগণের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের স্বাধীনতার সময় সমাগত, সরকার নিজেরা বুঝে নিন।’ ফলে ট্রাম্পের বর্তমান বক্তব্যকে অনেকেই মুখ রক্ষার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর কী হবে: চুক্তির চতুর্থ ও পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও সেনা অপসারণ করবে। বিপরীতে ইরান পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত ৬০ দিনের জন্য কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’ চালাবে এবং প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার জন্য ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে।

শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছিল বড় জটিলতা। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর ইরান এই প্রণালি বন্ধ করলে এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ আরোপ করে, যা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বিপর্যয় ঘটায়। সংঘাতের সময় কিছু জাহাজকে বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) সঙ্গে আলোচনা করে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল দিয়ে যাতায়াত করতে হতো। এর ফলে বীমা প্রিমিয়াম আকাশচুম্বী হওয়ায় মাইন অপসারণের গ্যারান্টি ছাড়া অনেক অপারেটর এই পথে চলতে নারাজ। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক প্রণালিতে টোল নেওয়া নিষিদ্ধ হলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো সেবামূলক ফি নিতে পারে। চুক্তিতে এ নিয়ে স্পষ্ট কিছু না থাকলেও ইরানের প্রধান আলোচক বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘হরমুজ প্রণালি যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরবে না’ এবং ইরান জাহাজ চলাচল থেকে ‘পরিষেবা ফি’ গ্রহণ করবে।

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের কী হবে: চুক্তির অষ্টম দফায় ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। আইএইএর (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে দেশেই ‘ডাউন-ব্লেন্ডিং’ বা ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমানোর পারস্পরিক সম্মত ব্যবস্থার ভিত্তিতে এই মজুত নিষ্পত্তি করা হবে।

ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা অস্ত্র তৈরির ৯০ শতাংশের খুব কাছাকাছি। সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয়। আমেরিকা এই মজুত তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানালেও ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি গত সপ্তাহে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নির্দেশ দেন যে, ইউরেনিয়াম কোনোভাবেই বিদেশে পাঠানো যাবে না। ফলে এই চুক্তি ইঙ্গিত করে যে, ওয়াশিংটন ইরানের ইউরেনিয়াম বাইরে পাঠানোর দাবির বদলে দেশটিতেই তা মিশ্রিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্তরে নামিয়ে আনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

ইরানের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কী বলা হয়েছে: সমঝোতা স্মারকের সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে একটি সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা অবসান করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। তবে এটি কেবল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নাকি জাতিসংঘের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সরকার জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে: নাহিদ ইসলাম

পিপলস্ ইন্স্যুরেন্স পিএলসিতে থ্যালাসেমিয়া সচেতনতা ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

এক উপদেষ্টাসহ আওয়ামী লীগের ৪ নেতার পদত্যাগ

শুধু ব্রাজিল নয়, ভারতকেও দুঃস্বপ্ন দেখিয়েছিলেন হালান্ড

দাবি স্বাস্থ্য কর্মকর্তার / আমি কখনো কাউকে স্যার সম্বোধন করতে বলিনি

সাভারে এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ, আহতদের পরিচয় প্রকাশ

রিহ্যাব সদস্যের সংবেদনশীল অঙ্গে আঘাত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

মেয়াদ শেষের আগেই নিয়োগ বাতিল ডেপুটি গভর্নরের

বৃষ্টি নামলেই বুক কাঁপে ফেনীবাসীর

এনসিপির সমাবেশে ককটেল বিস্ফোরণের পর থানা ঘেরাও

১০

টঙ্গীতে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ

১১

রিজার্ভ আরও বাড়ল

১২

১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা

১৩

ব্রাজিলের বিদায়ের পর বাংলাদেশি ভক্তদের ধন্যবাদ জানালেন রাষ্ট্রদূত

১৪

মিসর ম্যাচের আগে স্বস্তির খবর পেল আর্জেন্টিনা

১৫

এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৩

১৬

জাবি শিক্ষার্থীকে বাস থেকে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ, ৬ বাস আটক

১৭

সরকারি সম্পত্তি আত্মসাৎ / সালাম মুর্শেদীসহ ১৩ জনের বিচার শুরু

১৮

মিরপুরে ১৪ তলা ভবনে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৬ ইউনিট

১৯

পাহাড় ধসের শঙ্কা: পাঁচ জোনে বিভক্ত চট্টগ্রাম, ৮ শেল্টার হোম প্রস্তুত

২০
X