

ইলিশের দাম এ বছরও কমেনি। এর মূল কারণ উৎপাদন হ্রাস। সরকারি তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরের আগে ইলিশ আহরণ বেড়ে গেলেও এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে। সর্বশেষ চার বছরে উৎপাদন কমেছে সোয়া ৯ শতাংশের বেশি। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম নিচে নামছে না।
সোমবার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, ‘ইচ্ছে থাকলেও এবার কম দামে মানুষকে ইলিশ খাওয়াতে পারিনি। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন কম হওয়ায় আমাদের হাতে তেমন কিছু করার সুযোগ ছিল না। আমি এ জন্য দুঃখিত।’
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এ বছরের জুলাই ও আগস্টে ইলিশ আহরণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ২০ এবং ৪৭ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে। ওই দুই মাসে আহরণ হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৯৩ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২২ হাজার ৯৪২ টন কম। সার্বিকভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ ছিল পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ১২ হাজার ৮৫৮ টনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের জীবনচক্রে সমুদ্র ও নদী দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। মা ইলিশ ডিম ছাড়তে নদীতে আসে এবং জাটকা বেড়ে ওঠে সমুদ্রে; কিন্তু এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নানা কারণে। মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনায় অসংখ্য চর ও ডুবোচর তৈরি হওয়ায় নদীর নাব্য কমছে, পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। উজান থেকে আসা পলি নদী ভরাট করে ফেলছে। একই সঙ্গে অবৈধ জাল ব্যবহারে বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদনের জন্য হুমকি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১ মে থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোস্টগার্ড ১৭ হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে ৬৩১ জেলেকে আটক করেছে এবং জব্দ করেছে এক লাখ ১৩ হাজার কেজি জাটকা, ১১৭ কোটি মিটার অবৈধ জাল, চার লাখ ৭৯ হাজার বেহুন্দি জাল, ২৮টি বোট ও ১৬১টি ট্রলার। এসব অভিযানে আনুমানিক ৩ লাখ ৭০ হাজার টন মাছ রক্ষা পেয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৮ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা।
শুধু তাই নয়, অপরিকল্পিত বাঁধ, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, নদীর নাব্য হ্রাস, দূষণ এবং যান্ত্রিক নৌযানের নির্বিচার চলাচলও ইলিশের প্রজনন ও বিচরণে বড় বাধা। ফলে নদীতে ইলিশের প্রাপ্যতা দিন দিন কমছে।
অন্যদিকে, প্রাপ্যতা হ্রাস পাওয়ায় রপ্তানিও কমেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ভারতে ১২০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ১০৪ টনের মতো। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইলিশ উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে হলে নদীর নাব্য রক্ষা, অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণ এবং জেলেদের সচেতন করতে হবে। নাহলে উৎপাদন আরও হ্রাস পাবে, আর ইলিশের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাবে।