

ছুটির দিনের সকালে মাঝারি মাত্রার যে ভূমিকম্প পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল, তা স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ। যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে, দেশের পটভূমিতে সাম্প্রতিক সময়ে তা সর্বোচ্চ। এতে বেশিরভাগ মানুষ আতঙ্কিত ও ট্রমাটাইজড। দুটি প্লেটের সংযোগস্থলে এ ভূমিকম্পটি হয়েছে, ইন্দো-বার্মা টেকটনিক প্লেটে। কম্পনের তীব্রতা ছিল বেশ। ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে প্রচুর। শক্তি লকড অবস্থায় ছিল, আটকে ছিল। এটা আনলকিং শুরু হয়েছে। এখন পরবর্তীকালে বিরতি দিয়ে ফের হতে পারে ভূমিকম্প। সেক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক একমাত্র উপায় হচ্ছে মহড়া। ভূমিকম্পের সময় দু-এক কদমের মধ্যে নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়া, প্রশিক্ষণ নেওয়া। দেশের যে অবকাঠামো তা তো পরিবর্তন করা যাবে না।
বাংলাদেশের উত্তরে আছে ইন্ডিয়ান এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল; পূর্বে বার্মিজ ও ইন্ডিয়ান প্লেটের সংযোগস্থল। প্লেটগুলো গতিশীল থাকায় বাংলাদেশ ভূখণ্ড ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। ভূমিকম্পের ম্যাগনিটিউড যাই হোক না কেন, ভূপৃষ্ঠের উপরে যে কম্পন ইনটেনসিটি বলা হয়, সেটা স্থানভেদে ছিল পাঁচ থেকে ছয়। এটা খুবই তীব্র ছিল, এর আগে আমরা কখনো এরকম অনুভব করিনি। এর আগেও আমাদের অঞ্চলে ২০০৩ সালে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার ভূমিকম্প রাঙামাটির বরকলে হয়েছে। যদিও একটু দূরে ঢাকা থেকে; কিন্তু চট্টগ্রাম শহরে যারা ছিলেন, তারা অতটা অনুভব করেননি। আর এটা তো ঢাকা শহরে এবং এটা যেখানে হয়েছে সেটা হচ্ছে ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর দিক দিয়ে খুবই তৎপর্যপূর্ণ, কেননা ইন্ডিয়া এবং বার্মা প্লেট—এ দুটি প্লেটের সংযোগস্থলে ভূমিকম্পটি সংঘটিত হয়েছে। যেখানে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হাওর, মেঘনা নদী দিয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এই রেখা বরাবর ইন্ডিয়া প্লেটটি বার্মা প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এই রেখার পূর্ব প্রান্ত হচ্ছে বার্মা প্লেট, যেখানে রয়েছে সিলেট থেকে কক্সবাজার এই পাহাড়ি অঞ্চল। এটাকে আমরা বলি সাবডাকশন জোন, যেখানে একটা প্লেট সাবডাক্টেড হচ্ছে, তলিয়ে যাচ্ছে। এটা হচ্ছে নটোরিয়াস। এখানে ভূমিকম্পগুলো হয় নটোরিয়াস। এই একটা উৎস, আরেকটা উৎস হচ্ছে ডাউকি ফল্ট। তো আজকে (গতকাল) যেটা হয়েছে, সেটা হচ্ছে এ দুটি প্লেটের সংযোগস্থলে।
অনেক আগেই ১২ বছরের উপাত্ত দিয়ে গবেষণা করে ন্যাচার জিওসায়েন্সে আমরা এটা প্রকাশ করেছি। সেখানে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি এই সাবডাকশন জোনে ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রার শক্তিসম্পন্ন ভূমিকম্পের শক্তি জমা হয়ে আছে। যে কোনো সময় এই ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে। আজ হোক, কাল হোক, ৫০ বছর পর হোক তবে এটা হতেই হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। আজ (গতকাল) যেটা হলো, সেটা হচ্ছে এই যে, সাবডাকপশন জোনের ক্ষুদ্র একটা অংশে যেটা দুটি প্লেট আটকে ছিল। একটা প্লেটের সঙ্গে ফিকশনের কারণে আটকে ছিল তার একটা ক্ষুদ্র অংশ, এটা খুলে গেল। খুলে দিয়ে এখন শক্তিটা বের হয়ে গেল। তাহলে এই যে খুলে যাওয়ার একটা দ্বার উন্মোচন হলো, তাতে সঞ্চিত যে শক্তি আরও যেটা জমা হয়ে আছে কয়েকশগুণ, সেটা তাহলে এখন নিকট ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকম্প সামনে অপেক্ষা করছে।
ঢাকার এত কাছে গত কয়েক দশকে বড় ভূমিকম্প হয়নি। কয়েক প্রজন্ম এরকম ভূমিকম্প দেখেনি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও জনবহুল নগরী হওয়ায় এখন ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ঢাকা। এখানে বিভিন্ন রকম ভবন আছে। সেই ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকে শুরু করে পাকিস্তান পিরিয়ড এবং স্বাধীনতার পরে দেশে খুব দ্রুত অনেক প্রযুক্তিনির্ভর ভবন হয়েছে যেখানে হয়তো নকশায় অনেক ত্রুটি হয়েছে। নির্মাণসামগ্রীর বিষয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে এবং বিল্ডিং কোড ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়নি।
এমনকি বিল্ডিং কোডও আসলে ঠিক নয়। ত্রুটিযুক্ত বিল্ডিং কোড, যেখানে আমাদের ভূতত্ত্ববিদদের মতামত নেওয়া হয়নি। আমাদের বাদ দিয়ে সেই বিল্ডিং কোড করা হয়েছে। এই বিল্ডিং কোড সরকারি স্থাপনাতেই অনুসরণ করা হয় না। এটা একটা খারাপ দৃষ্টান্ত। আমাদের সামনে তো মহাবিপর্যয়; যে কোনো সময় তা হতে পারে। এখন আমাদের স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। তার মধ্যে আমি সবচেয়ে গুরুত্ব দেব স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায়। আমরা রাতারাতি নগরায়ণে পরিবর্তন আনতে পারব না। বিল্ডিংটাকে রেট্রোফিটিং করতে পারব না। আমরা যদি নগরবাসীকে আরও সচেতন করে তুলতে পারি স্মার্টফোনের মাধ্যমে। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আমরা আমাদের নগরবাসী বা দেশবাসীকে ভূমিকম্পের ব্যাপারে সচেতন করে গড়ে তুলতে সক্ষম হব খুব দ্রুত।
এবং এখানে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। এরপরে আমাদের নিয়মিত ভূমিকম্পের মহড়া করতে হবে এবং এই মহড়ার মাধ্যমে আমাদের মনোবল আরও বৃদ্ধি পাবে। তাহলে আমাদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে আমরা আনতে পারি। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারকার্য। আমি যদি ভূমিকম্পের আগে ব্যবস্থা না নিই, তাহলে ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার কার্যে যারা অংশ নেবেন তারাই যদি বেঁচে না থাকে, তাহলে আমার ওই পরিকল্পনা তো ভেস্তে যাবে এবং কোটি কোটি টাকা ওখানে, সেটা যত টাকা মানে তত বাণিজ্য। তো আমি বলছি যে তার ১ শতাংশেরও কম যদি এখানে আমি ব্যয় করি। তাইলে ওখানে তো আমার বাজেট অনেক কমে আসবে। সেটা আমি বারবার সরকারকে বলছি, এটার ব্যাপারে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তা আমি সবসময় এটার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছি, বলে আসছি।
ভূমিকম্পের মহড়ার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং মহড়ার মাধ্যমে মানুষের মনোবল বৃদ্ধি করা। যেমন আজকে ভূমিকম্পের সময় মানুষ ট্রমাটাইজড হয়ে গেছে। এইটা দিয়ে যদি আমরা মহড়ার মাধ্যমে নিজেদের অনুশীলন এবং মনোবল বৃদ্ধি করতাম তাহলে কিন্তু আমরা এরকম আতঙ্কিত হতাম না এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কম হতো।
(হুমায়ুন আখতার ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করেছেন কয়েক দশক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত আর্থ অবজারভেটরির তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন।)
লেখক : ভূতত্ত্ববিদ ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়