

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সদস্য এ এম এম নাসির উদ্দীন। তপশিল ঘোষণার পর থেকে দেশের পুরো প্রশাসন কার্যত অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে গেছে।
সংবিধান ও আচরণবিধি অনুযায়ী, তপশিল ঘোষণার পর সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত মাঠ প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কোনো ধরনের বদলি, পদায়ন, দায়িত্ব পরিবর্তন বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য নির্বাচন কমিশনের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অতীতে তপশিল ঘোষণার পর সরকার শুধু রুটিন দায়িত্ব পালন করত। এবারও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু সীমিত পরিসরে দৈনন্দিন কাজ করতে পারবে। তারা কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত, নতুন প্রকল্প গ্রহণ, বড় অর্থ বরাদ্দ ঘোষণা, বড় নিয়োগ কিংবা পদোন্নতিও দেওয়া যাবে না। নির্বাচনকালীন সময়ের এসব নিয়ম আগে যেমন ছিল, এবারও তা বহাল থাকবে।
ইসির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে নির্বাচন কমিশন কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিকভাবেও এ পদ্ধতিই অনুসৃত হয়।
তপশিল ঘোষণার পর ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা থেকে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পদ পর্যন্ত কোনো বদলি বা দায়িত্ব পরিবর্তনের জন্য সরকারের ইসির অনুমোদন নিতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তর বদলির প্রস্তাব পাঠালেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসি।
বিশেষ করে স্পর্শকাতর জেলা ও থানাগুলোয় পদায়নের ক্ষেত্রে ইসির বাড়তি নজর থাকবে। পূর্বে যেখানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাত, দলীয় প্রভাব বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে নির্বাচন কমিশন সরাসরি বদলির নির্দেশ দিতে পারবে।
মাঠ প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বদলিও ইসির অনুমোদনের মাধ্যমে হবে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনে বড় রদবদল করেছে। ডিসি, ইউএনও, ওসি, পুলিশ সুপার পদে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে তপশিলের পর এসব পদেও নতুন করে বড় রদবদল হতে পারে—এমন আভাস পাওয়া গেছে।
গত নভেম্বর মাসে ৫২টি জেলায় ডিসি পদে নতুন নিয়োগ দেওয়া হলেও দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকায় ১৮ জেলার ডিসিদের সরিয়ে নেওয়া হয়।
তপশিল ঘোষণার পর যে কোনো রাজনৈতিক দল, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কিংবা প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ দিলে, তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি করতে পারবে ইসি।
নির্বাচন পরিচালনায় প্রশাসনিক ও আর্থিক সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ ক্ষমতা এখন নির্বাচন কমিশনের হাতে।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে নির্বাচন কমিশন সচিব থেকে শুরু করে যে কোনো কর্মচারীকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারে। যদি রাজনৈতিক পক্ষপাত, ফ্যাসিবাদের সহায়তা বা অনৈতিকতার প্রমাণ থাকে, তাহলে কমিশন গুরুত্ব সহকারে তা বিবেচনায় নেবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, তপশিল ঘোষণার পর বেআইনি বা অনুমোদনহীন কোনো জনসমাবেশ, মিছিল কিংবা আন্দোলন করা হলে তা আইন লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এরই মধ্যে অ্যাকশনে নেমেছে পুলিশ। গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও করতে গিয়ে ২০ শতাংশ ভাতার দাবিতে আন্দোলনে নামা ছয়জনকে আটক করেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তপশিল ঘোষণার পর সরকারের একমাত্র দায়িত্ব নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা করা। যে কোনো দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার এখতিয়ার এখন আর সরকারের নেই, কারণ নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে নির্বাচন কমিশনের হাতে। সরকার চাইলেও এখন কোনো দাবি বাস্তবায়ন করতে পারবে না।