

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির অকুতোভয় যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে বৃহস্পতিবার রাতে জাতি ছিল শোকে মুহ্যমান, নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গোটা দেশ ছিল ক্ষোভে উত্তাল। এই ক্ষোভের মধ্যেই একদল মানুষ গণমাধ্যম অফিসে জ্বালাও-পোড়াও আর ভাঙচুর করে। দেশ যখন গণতন্ত্র উত্তরণে একটি সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এ ধরনের হামলা-হুমকিতে দেশজুড়েই নানা উদ্বেগ-শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। কী হবে, কী হচ্ছে—এমন উৎকণ্ঠা বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার দিনভরই ছিল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর বার্তা দিয়ে নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কাউকেই ছাড় না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা হয়। ওই রাতে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডেইলি স্টারের সামনে সহিংসতাকারীদের হাতে লাঞ্ছিত হন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর। একই রাতে ধানমন্ডিতে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। তৃতীয়বারের মতো হামলার শিকার হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ধ্বংসস্তূপ হওয়া বাড়ি। ঢাকায় এসব সহিংসতার আগে ওই রাতেই ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দিপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে তার লাশে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। একই রাতে খুলনার ডুমুরিয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন এক সাংবাদিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর দেশ এক সংকট থেকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে হাঁটছে। এর মধ্যেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও অকুতোভয় যোদ্ধা ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। হাদি ছিলেন ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী, তিনি নির্বাচনী জনসংযোগের মধ্যেও ছিলেন। তাকে গুলি করে হত্যার প্রতিবাদে দেশে সক্রিয় সব দল-মত, সংগঠন প্রতিবাদে মুখর। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতের ভয়াবহ সহিংসতা নির্বাচন বানচালের অংশ কি না, সেই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।
রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, পত্রিকা অফিসে হামলা পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপচেষ্টা। তবে এ ধরনের নাশকতা করে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না বলেও আশাবাদী রাজনৈতিক নেতারা।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দেশে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও ধারাবাহিক নিরাপত্তা ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবি করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেড় যুগ পর আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে দলের নেতাকর্মীরা ছাড়াও সারা দেশেই একটা উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার পর বিএনপির এই শীর্ষ নেতার নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
গত শুক্রবার রাতে হামলাস্থলগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও তার আগেই হামলাকারীরা সহিংসতা ছড়িয়ে দেয়। তবে গতকাল শুক্রবার রাজধানীসহ সারা দেশেই কঠোর অবস্থানে ছিল সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের ইউনিটগুলো।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এ সহিংসতাকারীদের প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জড়িতদের আইনের আওতায় নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। গতকাল সরকারের এক বিবৃতিতে কয়েকজন বিচ্ছিন্ন উগ্রগোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সঙ্গে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন, অগ্নিসংযোগ এবং জানমাল ধ্বংসের সব কর্মকাণ্ডকে দৃঢ়ভাবে ও দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে।
ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘দেশের ইতিহাসের এ সংকটময় সময়ে আমরা একটি ঐতিহাসিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি। যারা বিশৃঙ্খলাকে পুঁজি হিসেবে নেয় এবং শান্তির পথকে উপেক্ষা করে—এমন অল্প কয়েকজনের কারণে এ অগ্রযাত্রা আমরা কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দিতে পারি না এবং দেব না।
সরকার ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও নিউএজ–এর সাংবাদিকদের পাশে রয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘আপনারা যে সন্ত্রাস ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তার জন্য আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। সন্ত্রাসের মুখেও আপনাদের সাহস ও সহনশীলতা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানেই সত্যের ওপর হামলা। আমরা আপনাদের পূর্ণ ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিচ্ছি।
বিবৃতিতে ময়মনসিংহে এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনারও গভীরভাবে নিন্দা জানানো হয়। বলা হয়, নতুন বাংলাদেশে এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই। এ নৃশংস অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিকে সংকটময় মুহূর্ত উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা প্রত্যেক নাগরিকের প্রতি আহ্বান জানাই—সহিংসতা, উসকানি ও ঘৃণাকে প্রত্যাখ্যান ও প্রতিরোধের মাধ্যমে শহীদ হাদির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করুন।’
শুধু সরকার নয়, কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনসহ দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ বৃহস্পতিবারের রাতে সহিংসতার মতো কোনো হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকে সমর্থন করছে না। এ ধরনের অপকর্মে কারও প্ররোচনা ও ফাঁদে পা না দেওয়ার জন্যও রাজনৈতিক দল ও নেতারা আহ্বান জানিয়েছেন। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকেও সহিংসতা পরিহার করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশে সংঘটিত বিভিন্ন মব সন্ত্রাসের ঘটনা পুরো জাতিকে বিভক্ত করেছে বলে মন্তব্য করে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এসব সহিংস ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ড রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে।
গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ওসমান হাদির হত্যার বিচারসহ প্রতিটি মব সন্ত্রাসের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। মির্জা ফখরুল আরও উল্লেখ করেন, হাদি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা রেখে জনগণের কাছে গিয়েছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণের ভোটে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
গতকাল রাজধানীর গুলশানে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পত্রিকা অফিসে হামলা পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার একটি অপচেষ্টা। তবে এ ধরনের নাশকতা করে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগে থেকেই চিহ্নিত ও সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন ছিল।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বৃহস্পতিবারের মতো ভাঙচুর ও নাশকতা করার পরিকল্পনা রয়েছে জুলাইবিরোধী শক্তিগুলোর। আমরা যে কোনো ধরনের ভায়োলেন্স ও নাশকতার বিরুদ্ধে।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে তিনি উল্লেখ করেন, জনগণের ক্ষোভকে ব্যবহার করে কোনো হঠকারী গ্রুপ কোথাও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ অথবা কোনো নাশকাতমূলক কার্যক্রম যাতে করতে না পারে, সে ব্যাপারে সবাইকে ভূমিকা পালন করতে হবে।
এদিকে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির মৃত্যু-পরবর্তী সহিংসতার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক উপদেষ্টা ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ফেসবুকে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি দেশের সম্পদ রক্ষায় জনগণকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান।
সদ্য সাবেক আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম দেশের জনগণকে সতর্ক করে ফাঁদে পা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। শুক্রবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে বলেন, কিছু অতি-ডানপন্থি গোষ্ঠী ধ্বংসাত্মক এবং নৈরাজ্যকর রাজনীতির মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে, চরম অতি-ডানপন্থি রাজনীতির উত্থান রোধ করতে হবে। এটি একটি জরুরি জাতীয় দায়িত্ব।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেছেন। সেখানে প্রেস সচিব লেখেন, ‘দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে কর্মরত আমার সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য আতঙ্কিত, অশ্রুসিক্ত ফোন কল পেয়েছিলাম। আমার বন্ধুদের কাছে আমি গভীরভাবে দুঃখিত, আমি তোমাদের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছি। তোমাদের সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য ফোন করেছি; কিন্তু সেই সহায়তা সময়মতো পৌঁছায়নি।’
শফিকুল আরও লেখেন, ‘দ্য ডেইলি স্টার ভবনের ভেতরে আটকে পড়া সব সাংবাদিককে উদ্ধারের পর ভোর ৫টায় আমি ঘুমাতে যাই। কিন্তু ততক্ষণে এ দুটি সংবাদমাধ্যম দেশের ইতিহাসে গণমাধ্যমের ওপর সংঘটিত অন্যতম ভয়াবহ হামলা ও অগ্নিসংযোগের সাক্ষী হয়ে গেছে। … একজন সাবেক সাংবাদিক হিসেবে শুধু বলব, আমি দুঃখিত। লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি।’
সার্বিক পরিস্থিতিতে ওসমান হাদির হাতে গড়া ইনকিলাব মঞ্চ গতকাল ফেসবুক পেজে দেওয়া বিবৃতিতে বলেছে, ‘ইনকিলাব মঞ্চ ব্যতীত কারও কোনো নির্দেশনা বা প্ররোচনায় পা দেবেন না। আমরা খুব দ্রুতই কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করব। আমরা আমাদের শহীদ ভাইয়ের বিচার নিশ্চিত করেই ঘরে ফেরব, ইনশাআল্লাহ।’
বৃহস্পতিবার রাতে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার ও ছায়ানটে হামলা-অগ্নিসংযোগ ছাড়াও কুষ্টিয়ায় প্রথম আলোর অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনে হামলার চেষ্টার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ১২ জনকে আটক করে। ঢাকার উত্তরায় সাবেক এমপি হাবিব হাসানের বাড়ি ও চট্টগ্রামে সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাসায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়া রাজশাহীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যালয় গুঁড়িয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। তবে সরকারের কঠোর অবস্থানের পর গতকাল দেশে অপ্রীতিকর ঘটনার খবর মেলেনি। তারপরও সামনে কী হচ্ছে আর কী হতে পারে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার যেন শেষ নেই।