

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু ‘এসপায়ার টু ইনোভেট’ (এটুআই) প্রকল্পে প্রশাসনিক অস্থিরতা, আত্মীকরণ এবং আর্থিক অনিয়মের গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে। চব্বিশের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটিতে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী। কয়েকজন কনসালট্যান্ট ও চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই সিন্ডিকেট নিয়োগ, চুক্তি নবায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে। সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই এই গোষ্ঠী এখন পরিচিত এটুআইর ‘পঞ্চপাণ্ডব সিন্ডিকেট’ নামে। মাত্র দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে নানা অনিয়মের মাধ্যমে তারা তাদের বেতন বাড়িয়ে নিয়েছেন কয়েক গুণ।
কালবেলার হাতে আসা নথিপত্র বলছে, এটুআইয়ে আধিপত্য বিস্তার করা এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকা কর্মকর্তারা এক সময় মাসে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা বেতন পেতেন। তারা প্রভাব খাটিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে সেই বেতন বাড়িয়ে বর্তমানে মাসে ৫ লাখ টাকা পর্যন্তও পারিশ্রমিক নিচ্ছেন, যা তাদের সংশ্লিষ্ট পদের নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাদের কয়েক দফায় বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে। কারও বেতন দেড় থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়েছে, আবার কেউ অল্প সময়ের মধ্যেই জুনিয়র পদ থেকে উচ্চ বেতনের কনসালট্যান্ট বা সিনিয়র কনসালট্যান্ট পদে উন্নীত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এটুআইর এই ‘পঞ্চপাণ্ডব’ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন ‘প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট’ থেকে সরাসরি ‘হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট’ বনে যাওয়া আব্দুল্লাহ আল ফাহিম। তার সঙ্গে রয়েছেন মাজেদুল আলম, নাহিদ আলম, মোহাম্মদ আরিফুর রহমান ও শারমিন ফেরদৌসী। তারা সবাই কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানটির চেইন অব কমান্ড ভেঙে এবং কোনো ধরনের দাপ্তরিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ফাহিম ও তার সহযোগীরা নিজেদের বেতন কয়েক গুণ বাড়িয়ে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।
সরকারের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী কনসালট্যান্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বেশ কয়েকটি নিয়োগে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করেও কনসালট্যান্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই ফের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এটুআইর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে প্রকল্পের বাইরে থেকেও দুই ব্যক্তির প্রভাব ছিল। তাদের একজন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং অন্যজন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রভাব খাটিয়েছেন। তবে প্রকল্পের ভেতরে সিন্ডিকেট পরিচালনার মূল ভূমিকায় ছিলেন ফাহিম ও নাহিদ।
এমনকি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবকে অন্তর্বর্তী সরকারের আইসিটি পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগের বিষয়েও আব্দুল্লাহ আল ফাহিমের ভূমিকা ছিল বলেও আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ অভিযোগ করে বলেন, ফাহিম ও তার সিন্ডিকেটের এই অস্বাভাবিক উত্থান ও এটুআইয়ে একচ্ছত্র আধিপত্যের পেছনে ফয়েজ তৈয়্যবের সরাসরি মদদ ছিল।
টিএপিপি লঙ্ঘন করে সহকারী থেকে প্রধান: একসময় এটুআইর ই-ফাইলিং টিমে প্রোগ্রাম সহকারী হিসেবে কাজ করতেন ফাহিম। শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ২০২৩ সালে তাকে প্রকল্প থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলে গেলে তিনি ফের প্রকল্পে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, একদল অনুসারীকে নিয়ে এটুআই কার্যালয়ে চাপ সৃষ্টি করে তৎকালীন প্রকল্প পরিচালককে কার্যত কোণঠাসা করা হয়। এরপর নিজেকে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার প্রধান বা হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অথচ এ পদে বসার জন্য কোনো ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট পদে কনসালট্যান্ট নিয়োগে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ না করেও তিনি এই পদে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এটুআইর সংশোধিত কারিগরি সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব (আরটিএপিপি) অনুযায়ী, এমন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৮ বছরের অভিজ্ঞতা এবং কমপক্ষে ৪ বছরের প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ফাহিমের কর্মজীবন শুরু হয়েছে ২০১৬ সালে। ২০২৪ সালের মধ্যেই তার পূর্ণ অভিজ্ঞতা মাত্র ৮ বছর, যার বড় অংশ প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
এটুআইতে ফাহিম ৪ বছরের বেশি সময় কাজ করলেও তার বড় সময় ‘ইয়াং প্রফেশনাল’ (ইন্টার্নের ঠিক ওপরের ধাপ) এবং ‘প্রজেক্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট’ পদে কেটেছে। এ পদগুলো প্রকৃত প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য হয় না। তিনি একটি সফটওয়্যার ফার্মের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে দেড় বছর দায়িত্ব পালন করেছেন বলে দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি প্রফেশনাল প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের অভিজ্ঞতা নয়, বরং শুধু মালিকানা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সরকারি বা আন্তর্জাতিক কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের কোনো পর্যায়ে ফাহিমের চার বছরের প্রকৃত প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট অভিজ্ঞতা নেই।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কনসালট্যান্ট হিসেবে এটুআইয়ে ফিরে আসেন ফাহিম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কোনো প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া ছাড়াই নামসর্বস্ব কয়েকটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় কনসালট্যান্ট পদের বেতনসীমার সর্বোচ্চ পর্যায়েই তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
আব্দুল্লাহ আল ফাহিম একসময় তৃতীয় পক্ষের চুক্তিতে ‘প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে কাজ করতেন এবং মাসিক ৭০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেতেন। পরে তিনি কনসালট্যান্ট হিসেবে প্রকল্পে ফিরে এসে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে বর্তমানে মাসিক পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন নিচ্ছেন।
এটুআইতে ফিরে আসার পর প্রথমে মাসিক সাড়ে তিন লাখ টাকা বেতনে চুক্তিবদ্ধ হন। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব (ডিপিপি) হালনাগাদ করে কনসালট্যান্ট পদের সর্বোচ্চ বেতনসীমা সাড়ে চার লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নিয়োগের মাত্র তিন মাসের মাথায় ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি তার বেতন বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের জন্য নতুন চুক্তিতে মাসিক পাঁচ লাখ টাকায় তাকে নিয়োগ দেয় এটুআই, যা নির্ধারিত বেতনসীমারও বেশি।
ফাহিমের শুরুটা আত্মীয়তার সূত্রেই: প্রকল্পের সঙ্গে ফাহিমের সম্পৃক্ততার শুরু হয়েছিল মূলত আত্মীয়তার সূত্রে। ২০১৮ সালে প্রথম ‘ইয়াং প্রফেশনাল’ হিসেবে এটুআই প্রকল্পে যুক্ত হন। সে সময় এটুআইয়ে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করছিলেন সরকারি কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিলুফা ইয়াসমিন ফাহিমের খালা। তার সুপারিশেই ফাহিম প্রকল্পে প্রথম নিয়োগ পান। বর্তমানে উপসচিব হিসেবে কর্মরত এই নিলুফা ইয়াসমিন ছিলেন আইসিটি ডিভিশনের ‘হার পাওয়ার’ প্রকল্পের ডিপিডি। বিসিএস ৩০ ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে পরে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হয়।
সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নিলুফা ইয়াসমিন প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করার সময়েও নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তিনি আইসিটি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন। এটুআইয়ে দায়িত্ব পালনকালে নিজের আত্মীয়কে নিয়োগ দেওয়া এবং বিভিন্ন বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সম্মানী নেওয়ার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘হার পাওয়ার’ প্রকল্পে যুক্ত হন। ওই প্রকল্পের নানা অনিয়মের সঙ্গেও তার নাম উঠে আসে।
নিয়মবহির্ভূত বেতন বৃদ্ধি, ফাহিমের ছয় গুণের বেশি: জানা গেছে, ফাহিমের নিয়োগের সঙ্গে বেতন বৃদ্ধিতেও মানা হয়নি টিএপিপি। এটুআই প্রকল্পের টিএপিপি অনুযায়ী, হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট পদে ১৮ মাসের জন্য সর্বোচ্চ ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দ। সেই হিসাবে এই পদে মাসিক বেতন হওয়ার কথা সর্বোচ্চ ৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। কিন্তু প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মাসে ৫ লাখ টাকা বেতন দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি সরকারি বা উন্নয়ন প্রকল্পে বেতনসীমা লঙ্ঘনের বিরল একটি ঘটনা। প্রকল্পের অন্য কনসালট্যান্টদের তুলনায় ফাহিমের বেতন ২০-২৫% বেশি। নির্ধারিত বেতনসীমারও বেশি বেতন চুক্তি করায় একসময় ৭০ হাজার টাকা পাওয়া ফাহিমের বেতন বেড়েছে ছয় গুণের বেশি।
সিন্ডিকেটের অন্যদেরও বেতন বেড়েছে কয়েকগুণ: শুধু ফাহিমের নয়, তার ঘনিষ্ঠ সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদেরও অল্প সময়ে বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফাহিম সিন্ডেকেটের অন্যতম সদস্য হলেন এটুআইতে সিনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত নাহিদ আলম। নাহিদ আলমের ক্ষেত্রেও চুক্তি ও পদোন্নতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নথি বলছে, ৫ আগস্টের আগে কনসালট্যান্ট হিসেবে আড়াই লাখ টাকা বেতন ছিল নাহিদ আলমের। মেয়াদ শেষে ওই বছরের অক্টোবরে নতুন চুক্তিতে তার বেতন বাড়িয়ে সাড়ে ৩ লাখ করা হয়, যা ছিল ওই পদে বেতনের সর্বোচ্চ সীমা।
নতুন চুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে আবার ‘সিনিয়র কনসালট্যান্ট’ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে নতুন চুক্তিতে বেতন নির্ধারণ করা হয় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। অথচ তখনো কম বেতনে নাহিদের পূর্বের চুক্তির মেয়াদ আরও ছয় মাস অবশিষ্ট ছিল। অর্থাৎ আগের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ছাড়াই তাকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পূর্বের চুক্তি চলমান থাকা অবস্থায়ও নতুন পদে উচ্চ বেতনে আরেকটি চুক্তি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সহযোগী হিসেবে প্রকল্পের মানব সম্পদ বিভাগের দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ আরিফুর রহমানের নামও উঠে এসেছে। নতুন চুক্তিতে তার মাসিক বেতন ২ লাখ ৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে সাড়ে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ ৫ আগস্টের পর আরিফুর রহমানের বেতন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি।
জুনিয়র কনসালট্যান্ট শারমিন ফেরদৌসীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। আগে তিনি মাসে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেতেন। নতুন চুক্তিতে তা বাড়িয়ে প্রথমে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা করা হয়। পরবর্তী সময়ে আরেক দফা চুক্তিতে তার বেতন দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকায়। সেই হিসাবে শারমিনের বেতনও বেড়েছে দ্বিগুণের কাছাকাছি।
ফাহিমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মাজেদুল আলম অল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পেয়েছেন। ৫ আগস্টের আগে তিনি জুনিয়র কনসালট্যান্ট হিসেবে প্রায় ৭০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেতেন। পরবর্তী সময়ে কনসালট্যান্ট পদে উন্নীত হওয়ার পর তার বেতন এক লাফে ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়। এরপর চুক্তি নবায়নের সময় তা আরও বাড়িয়ে ২ লাখ ৭১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আয় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।
অভিজ্ঞতার বাইরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব: এটুআইর অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের অনেককেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তদন্তের অজুহাতে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে আগাম নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের বসানোর লক্ষ্যেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এটুআইর কিছু ডিজিটাল অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত কাজ ব্যক্তিগত আইটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে এই গোষ্ঠীর কয়েকজন সদস্য এটুআইর গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ইউনিটের তদারকি করছেন। তাদের মধ্যে প্রকল্পের ‘হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আবদুল্লাহ আল ফাহিম বর্তমানে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, মনিটরিং অ্যান্ড ইভাল্যুয়েশন, পলিসি অ্যান্ড লেজিসলেশন, কমার্শিয়ালাইজেশন, এজেন্সি ফর্মেশন, একপে, ডিজিটাল সেন্টার, সাথী নেটওয়ার্ক, একপাস, ডি-টোল, নাগরিক সেবা, ইউবিআইডি, সিএলটিপি এবং কমিউনিকেশন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ টিমের তদারকি করছেন। যদিও সংশ্লিষ্টদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফাহিমের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এটুআইয়ে যোগ দেওয়ার আগে এবং কর্মজীবনের প্রাথমিক সময়ে তিনি মূলত নথি (ই-ফাইলিং) টিমে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।
প্রকল্পের আরেক কর্মকর্তা মো. নাহিদ আলম বর্তমানে সিটিজেন ইনোভেশন, ডিজঅ্যাবিলিটি ইনোভেশন, ইনোভেশন ল্যাব, ফাইন্যান্স, অ্যাডমিন এবং আইটি সাপোর্ট টিমের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ ফাইন্যান্স বা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এ ছাড়া এ কে সাব্বির মাহবুব দুই বছর ধরে প্রকল্পে রিসোর্স মোবিলাইজেশন ও ইন্টারন্যাশনাল পার্টনারশিপবিষয়ক কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ ক্ষেত্রেও তার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। পাশাপাশি এ খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হলেও তাকে মাসিক ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতন প্রদান করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে প্রকল্পের ভেতরে ও বাইরে প্রশ্ন উঠেছে।
নিয়োগ পদোন্নতিতে আত্মীয়করণ: সাম্প্রতিক সময়ে এটুআই প্রকল্পে নতুন করে প্রায় ৫৬ জনকে বিভিন্ন পদে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব নিয়োগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফাহিম এবং তার সিন্ডিকেটের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে প্রকিউরমেন্ট সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা ইয়াং প্রফেশনাল মো. সাব্বির হোসেন সম্পর্কে ফাহিমের বোন জামাই। মাইগভ টিমের জুনিয়র কনসালট্যান্ট তৌহিদা ফাতেমা ফাহিমের খালার ননদ, ফাইন্যান্স বিভাগের মো. আবু হাসান ফাহিমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত। একইভাবে মাজেদুল আলমকেও তার বন্ধু হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়েছে।
এটুআই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ পরিচালিত হয়। কিন্তু এ প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টন, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও উচ্চ বেতনের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুযায়ী কনসালট্যান্ট নিয়োগে নির্ধারিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। দায়িত্ব বণ্টন ও অস্বাভাবিক বেতন বৃদ্ধির ধারা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ ছাড়া নির্ধারিত সুবিধার বাইরে প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার এবং একজন কনসালট্যান্টের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এটুআই প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ছাড়াও ইউএনডিপিসহ একাধিক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু নিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় কয়েকটি দাতা সংস্থার মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফাহিম ও তার সিন্ডিকেটের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার জন্য হুমকি। বেতন লঙ্ঘন, অযোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, আত্মীয়করণ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া—সবই প্রকল্পের কার্যকারিতা ও দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এটুআই প্রকল্পের হেড অব প্রোগ্রাম ম্যানেজমেন্ট আব্দুল্লাহ আল ফাহিম কালবেলাকে বলেন, তার নিয়োগ এবং বেতন বৃদ্ধি শতভাগ নিয়ম মেনেই হয়েছে। সবকিছুই পিপিআর ও টিএপিপি অনুযায়ী হয়েছে। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের উচ্চ বেতনে নিয়োগ বা প্রভাব খাটানোর অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। ফাহিমের দাবি, দুর্নীতির কারণে যাদের চুক্তি বাতিল হয়েছে, তারাই প্রতিহিংসাবশত মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
নিয়োগ এবং বেতনে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক মোহা. আব্দুর রফিকের সঙ্গে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে যুগ্ম প্রকল্প পরিচালক মো. রশিদুল মান্নাফ কবীরের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবকিছু পিপিআর এবং টিএপিপি অনুযায়ী করা হয়েছে। তার দাবি এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা আত্মীয়করণ হয়নি এবং সবকিছু নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে।
ফাহিম এবং যুগ্ম প্রকল্প পরিচালক মো. রশিদুল মান্নাফ কবীর টিএপিপি মেনে নিয়োগ এবং বেতন বৃদ্ধির কথা বললেও তথ্য বলছে টিএপিপি লঙ্ঘন করে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
তথ্য ও প্রযুক্ত বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক এটুআই প্রকল্প পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা কালবেলাকে বলেন, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বা বেতন বৃদ্ধির বিষয়গুলো তার জানা নেই। পরবর্তী সময়ে চুক্তি নবায়ন বা বেতনের শর্ত কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, সেটি প্রকল্প কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবে। তবে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, এটুআইর এ পদগুলো সম্পূর্ণ চুক্তিভিত্তিক, কোনো স্থায়ী সরকারি চাকরি নয়। ফলে কেউ যদি পারফর্ম না করে বা নিয়োগে কোনো অনিয়ম থাকে, তবে তাকে যে কোনো সময় সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ কর্তৃপক্ষের রয়েছে।
প্রভাব খাটিয়ে ফাহিমের নিয়োগের বিষয়ে মামুনুর রশীদ সরাসরি কিছু বলতে না চাইলেও ৫ আগস্টের পর সারা দেশের মতো আইসিটি বিভাগেও একটি অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।