

রেলওয়েতে ইঞ্জিন সংকটের কারণে বন্দর ও আইসিডিতে আবারও আমদানি-রপ্তানি কনটেইনার জট তীব্র হচ্ছে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর নিয়ে চুক্তি ইস্যুতে সৃষ্ট অচলাবস্থায় একসময় আমদানি কনটেইনারের মজুত ২ হাজার ছাড়িয়ে গেলেও রেলওয়ে ইঞ্জিন বাড়িয়ে তা দ্রুত ২০০টিতে নামিয়ে এনেছিল। তবে ঈদের আগে ও পরে ইঞ্জিন কমিয়ে ফেলায় ফের কনটেইনার জট বেড়েছে। চট্টগ্রামের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ডে অন্তত পাঁচটি কনটেইনার ট্রেন লোডিং হওয়ার পরও ইঞ্জিন সংকটে আটকে রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রোজার মাঝামাঝি পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের জন্য ইঞ্জিন সংখ্যা ৬টিতে উন্নীত করা হলেও ঈদের এক সপ্তাহ আগে একটি রেখে বাকি পাঁচটি ইঞ্জিন সরিয়ে নেয় যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগ। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কনটেইনার ও জ্বালানীবাহী ট্রেন চালাতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে বারবার তাগাদা দিলেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এতে অনেক আমদানিকারক ঈদের আগে পণ্য আনলেও তা দেশব্যাপী সরবরাহ করতে পারেননি। গত ১৬ মার্চ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৯টি কনটেইনার ট্রেন লোডিং অবস্থায় ছিল, যার মধ্যে মাত্র একটি ইঞ্জিন দিয়ে গত এক সপ্তাহে ৪টি ট্রেন ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর অভ্যন্তরে কনটেইনারের মজুত ২৫০ থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হলেও ট্রেনের অভাবে তা পরিবহন করা যাচ্ছে না। এতে ঢাকার ব্যবসায়ীরাও রপ্তানিমুখী কনটেইনার বন্দরে পাঠাতে না পেরে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
রেলের পরিবহন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পণ্য পরিবহনে ইঞ্জিনের চাহিদা ১৯টি হলেও অন্তত ১৬টি ইঞ্জিন থাকলে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব। সম্প্রতি যাত্রীবাহী ট্রেনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পণ্য খাতের ইঞ্জিন সংখ্যা একটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে মোট ৬ দিন সড়কে পণ্যবাহী যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা রেলপথে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করলেও ইঞ্জিন সংকটে সে সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের ৬৯ শতাংশ মিটারগেজ ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়ায় সেগুলো প্রায়ই বিকল থাকছে। যদিও সোমবার পূর্ব রেলে ইঞ্জিনের সরবরাহ ৮২টিতে উন্নীত করা হয়েছে, তবুও যাত্রীবাহী ট্রেনের চাপে পণ্য খাত উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, সরকার রেলওয়েকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে চায়। রমজানের আগে থেকে রেলওয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ পণ্যবাহী ট্রেন পরিবহন করে বন্দর ও আইসিডিতে থাকা কনটেইনারের জট শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনেছিল। তবে ঈদ ও ঈদ-পরবর্তী যাত্রী পরিবহনকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। আমরা যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে এ বিষয়ে তাগাদা দিয়েছি ইঞ্জিন সরবরাহ বাড়িয়ে দিতে।
এ বিষয়ে পরিবহন বিভাগ থেকে যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগকে দেওয়া চিঠিতে জানানো হয়েছে, ১২ মার্চ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত ইঞ্জিন সরবরাহ অস্বাভাবিক কমিয়ে দেওয়ায় ৯টি কনটেইনার ট্রেন লোডিং অবস্থায় বসে আছে। এ ছাড়া আখাউড়ায় জ্বালানি পরিবহনের খালি ট্রেন এবং সিজিপিওয়াইতে শ্রীমঙ্গলগামী জ্বালানীবাহী ট্রেন লোডিং অবস্থায় অলস বসে আছে। তিন দিন ধরে জ্বালানি বোঝাই ট্রেন বসে থাকায় দেশে চলমান জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী সাদেকুর রহমান বলেন, এতদিন ধরে পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য পর্যাপ্ত ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঈদে যাত্রী পরিবহন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় কিছু ইঞ্জিন সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এরপরও কয়েকদিনের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়ানো হবে।
রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, রেলওয়ে কেবল রাজস্ব আয়ের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জ্বালানি নিরাপত্তা গতিশীল রাখতে কাজ করে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পণ্য পৌঁছানোর সময় এমনিতেই বেড়ে গেছে, তার ওপর কমলাপুর আইসিডিতে আটকে থাকা কনটেইনারগুলো সময়মতো বন্দরে না পৌঁছালে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে।