

সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ৫০ সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭ জন কোটিপতি পরিবারের। তাদের মধ্যে ২৭ জন বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বধীন জোটের ১০ জন রয়েছেন। এ সংখ্যা মোট সংসদ সদস্যের ৭৪ শতাংশ।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন’-সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। উপস্থিত ছিলেন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজনের ঢাকা মহানগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ক্যামেলিয়া চৌধুরী এবং কর্মসূচি ব্যবস্থাপক সজল কোরায়েশী।
নির্বাচন কমিশনে (ইসি) সংসদ সদস্যদের জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী সম্পদের এ বিবরণী সাজানো হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এতে বলা হয়, ১৭ জনের পরিবারের ১ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির ৮ জন, জামায়াত জোটের ৯ জন। আর ২০ জনের পরিবারের পাঁচ কোটির ওপরে সম্পদ রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন শুধু জামায়াতের, সবাই বিএনপির। ৫ লাখের নিচে সম্পদ রয়েছে দুজনের, তাদের একজন বিএনপির, আরেকজন জামায়াত জোটের। এ ছাড়া বিএনপির একজন সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেননি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সংসদ সদস্যের মধ্যে যাদের পরিবারের আয় সবচেয়ে বেশি, তাদের ১০ জনই বিএনপির। এর মধ্যে বছরে কোটি টাকার বেশি আয় করেন শামীম আরা বেগম, জহরত আদিব চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা ও আন্না মিনজ। এ ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যদের আয়ের তথ্যের পাশাপাশি নির্ভরশীলদের তথ্য যুক্ত করেছে সুজন। বিএনপির দুজন সংসদ সদস্যের পরিবার বছরে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা আয় করে। বছরে দুই লাখ টাকার কম আয় দুজনই জামায়াত জোটের। এ ছাড়া সাতজন হলফনামায় আয়ের তথ্য দেয়নি।
১০ জনের পরিবারের ঋণ ও দায়দেনা রয়েছে: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১০ জনের পরিবারের ঋণ ও দায়দেনা রয়েছে। তাদের মধ্যে চার জন বিএনপির, জামায়াত জোটের দুজন আছেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৪০ জনের আয়কর দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ১০ জন হলফনামায় আয়কর বিবরণী জমা দেননি। আয়কর বিবরণী জমা দেওয়া ৪০ জনের মধ্যে বছরে লাখ টাকার বেশি আয়কর দেন, এমন সংসদ সদস্য আছেন ১৩ জন।
৭৮ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত: সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে ৭৮ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর)। উচ্চশিক্ষিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিএনপির ৩২ আর জামায়াত জোটের ১১ জন। এই সংসদ সদস্যদের অর্ধেকের বয়স (২৫ জন) ৩৬ থেকে ৫৫ বছরের মধ্যে। এ ছাড়া ৫৬ থেকে ৭৫ বছর বয়সী আছেন ১৮ জন, ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী আছেন চারজন, ৭৫ বছরের বেশি বয়সী আছেন ১ জন। বয়স উল্লেখ করেননি দুজন।
আইনজীবী ও ব্যবসায়ী বেশি: ৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে আইনজীবী ১৩ জন আর ১০ জনের পেশা ব্যবসা। আইনজীবীদের মধ্যে বিএনপির ১১ জন আর ১১ দলীয় জোটের আছেন দুজন। আর ১০ জন ব্যবসায়ীর সবাই বিএনপির। এ ছাড়া চারজন শিক্ষক, একজন চাকরিজীবী ও পাঁচজন গৃহিণী। পেশা হিসেবে রাজনীতি উল্লেখ করেছেন ছয়জন। এ ছাড়া আটজন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। হলফনামায় তিনজন পেশার ঘর পূরণ করেননি।
ছয়জন এখনো মামলার আসামি: সংসদ সদস্যদের মধ্যে ছয়জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে। তারা সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। এ ছাড়া অতীতে মামলা ছিল ২১ জনের বিরুদ্ধে। অতীত ও বর্তমান উভয় সময়ে মামলা ছিল বা রয়েছে, এমন সংসদ সদস্যের সংখ্যা চারজন। ৩০২ ধারায় বর্তমানে মামলা রয়েছে একজনের বিরুদ্ধে এবং অতীতেও মামলা ছিল একজনের বিরুদ্ধে।
জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলই কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সুজনের সুপারিশ: নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে কার্যকর ও অর্থবহ করার জন্য কতগুলো শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে সুজন। শর্তগুলো হলো সংরক্ষিত নারী আসনের পদ্ধতিটিকে দলীয় নেতৃবৃন্দের অনুগ্রহনির্ভর ‘টোকেনিজমে’ পরিণত না করে সংসদে পর্যাপ্তসংখ্যক নারী প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা; সংরক্ষিত আসনেও সাধারণ আসনের মতো প্রত্যক্ষ ভোটের নির্বাচনের বিধান করা; জনগণের কাছে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের দায়বদ্ধতার বিধান তৈরি; এই আসন সংরক্ষণ পদ্ধতি এমন করা, যাতে কোনো দ্বৈততা (ওভারল্যাপিং) না থাকে, এ ক্ষেত্রে ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে সরাসরি আসনভিত্তিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে; সাধারণ আসনের মতো সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব হবে সমান; সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ভিত্তি হবে নারী রাজনীতিবিদের যোগ্যতা; সংরক্ষিত আসনের পদটিকে দলীয় নেতৃবৃন্দ, বিশেষত দলীয় প্রধানের পৃষ্ঠপোষকতা বা অনুগ্রহ বণ্টনের হাতিয়ারে পরিণত না করা এবং নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসনের লক্ষ্য অর্জনের ন্যায়সংগত ধারণা সামনে রেখে সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল থেকে নির্দিষ্ট হারে প্রার্থী মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা।