

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা শুভেন্দু অধিকারী। গতকাল শনিবার কলকাতার স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে অগণিত মানুষের উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ গ্রহণ করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে তাকে শপথ পাঠ করান রাজ্যপাল আর এন রবি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যটিতে এক ঐতিহাসিক পালা বদলের সূচনা হলো। তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আরোহণ করল বিজেপি।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে দুই দফায় ভোট গ্রহণের পর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয় গত ৪ মে। নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে ২০১১ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস জয় পায় ৮০টি আসনে।
গতকাল পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর শুভেন্দু অধিকারীর পিঠ চাপড়ে দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শপথ উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ও আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা থেকে শুরু করে বিজেপির একঝাঁক শীর্ষ নেতৃত্ব উপস্থিত ছিলেন, যা এই রাজ্যে বিজেপির জয়ের গুরুত্বকে স্পষ্ট করে দেয়।
ছাত্রনেতা থেকে পশ্চিমবঙ্গের নবম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু: নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই রাজনৈতিক উত্থান কোনো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। মেদিনীপুরের এক পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা শুভেন্দুর রাজনৈতিক যাত্রা শুরু ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে। বাবা শিশির অধিকারী ছিলেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। বাবার পথ অনুসরণ করেই শুভেন্দু রাজনীতিতে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে যখন ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে, সেই ‘পরিবর্তন’-এর নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ছিলেন শুভেন্দু। বিশেষ করে নন্দীগ্রামের কৃষক আন্দোলনে তার সাংগঠনিক দক্ষতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছিল।
পরবর্তী সময়ে শুভেন্দু মেদিনীপুরের সাংসদ এবং রাজ্য মন্ত্রিসভার পরিবহনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্বের কারণে ২০২০ সালে তিনি তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। এর পর থেকেই তিনি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সরব হন। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি জয়ী না হলেও শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে তৃণমূল কংগ্রেসপ্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর পাশাপাশি নন্দীগ্রাম আসন থেকেও তিনি জয়ী হয়েছেন। এর আগে ২০২১ সালে তিনি নন্দীগ্রামেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমা শুভেন্দুকে এবার রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন করল। একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অতি বিশ্বস্ত ‘সেনাপতি ও ডান হাত’ হিসেবে পরিচিত শুভেন্দু এখন সেই মমতারই উত্তরসূরি হিসেবে মহাকরণের মসনদে বসলেন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জামানা শুরু: শুভেন্দু অধিকারীর শপথের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপির শাসনকাল শুরু হলো। এই জয়কে বিজেপির আদর্শিক জয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মভিটায় এই প্রথম গেরুয়া পতাকা উড়ল। শপথ অনুষ্ঠানে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজনাথ সিং ও জেপি নাড্ডার উপস্থিতি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই রাজ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটায়। গতকাল নতুন মুখ্যমন্ত্রীর শপথ ঘিরে কলকাতার ব্রিগেডের ময়দানে ছিল সাজ সাজ রব। আদিবাসী নাচ, ছৌ নাচ ও গ্রাম-বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে এক বাঙালি আবহ তৈরি করা হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীতে এই শপথ অনুষ্ঠান হওয়ায় মঞ্চে কবিগুরুর ছবিতে মাল্যদান করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রসগোল্লা, দই ও ঝালমুড়ির মতো বাংলার চিরাচরিত খাদ্যের আপ্যায়নে বিজেপি প্রমাণ করতে চেয়েছে তারা ‘বাঙালিয়ানা’র সঙ্গেই ক্ষমতায় এসেছে।
শুভেন্দুর সঙ্গে শপথ নিলেন পাঁচ মন্ত্রী: গতকাল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আরও পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা শপথ গ্রহণ করেছেন। তারা হলেন—দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, অশোক কীর্তনিয়া, নিশীথ প্রামাণিক ও ক্ষুদিরাম টুডু। খড়্গপুর সদর থেকে জয়ী দিলীপ ঘোষ ২০১৪ সালের পর রাজ্যে বিজেপির ভিত শক্ত করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ওবিসি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আসানসোল দক্ষিণ থেকে জয়ী অগ্নিমিত্রা পাল কায়স্থ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং দলের অন্যতম পরিচিত মহিলা মুখ। বনগাঁ উত্তর থেকে জয়ী অশোক কীর্তনিয়া মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। কোচবিহারের মাথাভাঙা থেকে জয়ী তরুণ নেতা নিশীথ প্রামাণিক রাজবংশী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বাঁকুড়ার রানিবাঁধ থেকে জয়ী হওয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতা ক্ষুদিরাম টুডু সাঁওতালি ভাষায় শপথ গ্রহণ করে বিশেষ নজর কেড়েছেন।
সামাজিক মাধ্যমে ‘স্ট্যাটাস’ বদল করলেন মমতা: পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের শোচনীয় পরাজয় হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরুতে পদত্যাগ করতে রাজি হননি, বরং দাবি করেন ১০০টিরও বেশি আসনে ভোট লুট হয়েছে। তবে গত ৭ মে তার সরকারের মেয়াদ শেষ হলে সাংবিধানিকভাবেই ক্ষমতাচ্যুত হন মমতা। এরপর শনিবার শুভেন্দু অধিকারী যখন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, প্রায় একই সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল পরিবর্তন করেন। এতদিন নিজেকে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া মমতা এখন তার প্রোফাইলে লিখেছেন, ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারপারসন এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ বিধানসভা)’। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি সরাসরি ‘সাবেক মুখ্যমন্ত্রী’ শব্দটি ব্যবহার না করে নিজের তিনটি মেয়াদের কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিচয়ে যুক্ত করেছেন ‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী’।
ক্ষমতা হারিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা মুখ খুলছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে: নির্বাচনে বড় বিপর্যয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন প্রকাশ্যে। দলের হেভিওয়েট নেতা ও সাবেক মন্ত্রীরা সরাসরি দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। মালদা জেলার প্রবীণ নেতা কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের করপোরেট স্টাইলে দল চালিয়ে তৃণমূলকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছেন। দলের একাংশের মতে, আইপ্যাক-এর মতো পরামর্শদাতা সংস্থার অতিরিক্ত মাতবরি এবং তৃণমূল স্তরের মানুষের পালস বুঝতে না পারাই এই পরাজয়ের মূল কারণ।
বিজেপি প্রার্থী কৌস্তভ বাগচীর কাছে পরাজিত হয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক রাজ চক্রবর্তী এরই মধ্যে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি অভিযোগ করেছেন, অরূপ বিশ্বাসের মতো সিনিয়র নেতাদের কারণে তিনি কাজ করার সুযোগ পাননি। এমনকি অর্থের বিনিময়ে টিকিট বিলির গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন নির্বাচনের টিকিট না পাওয়া অনেক নেতা। এই পরিস্থিতিতে পরাজয়ের দায় কার, তা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরমহলে দ্বন্দ্ব এখন চরমে।