

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মভূমি আজ গেরুয়াময়। বিজেপি এখন বলতেই পারে—‘জহাঁ জন্মে মুখার্জি ও বঙ্গাল হামারা হে’ (যে বাংলায় শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জি জন্মগ্রহণ করেছেন, সেই বাংলা আমাদের)। পশ্চিমবঙ্গে জন্ম নেওয়া শ্যামাপ্রসাদ ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসংঘ, যা আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির পূর্বসূরি বা মূল সংগঠন। সেই জনসংঘের নেতাদের হাতে গড়া বিজেপিই এখন বাংলার মসনদে। ৭৫ বছর পর গতকাল শনিবার সরকার গঠনের শপথ নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে বিজেপি। বঙ্গবিজয়ের জন্য যুগের যুগের পর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে দলটি। তবে এতদিন সেই স্বপ্ন অধরা ছিল। একবার তো বিজেপির ‘প্রাণপুরুষ’ লালকৃষ্ণ আদবানি আক্ষেপ করে বলেছিলেন—শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যে বাংলায় জন্মেছিলেন, সেখানে বিজেপি ভোটে জিততে পারছে না। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ জুটির হাত ধরে শ্যামাপ্রসাদের মাটিতে সেই আক্ষেপ ঘুচেছে, এসেছে রেকর্ড জয়। গত ৪ মে ভূমিধস জয়ের পর বিজেপির সেই ‘আধ্যাত্মিক গুরু’র প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভোলেননি বিজেপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। শপথের মঞ্চেও তার এক ঝলক দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন হুমায়ূন কবির
স্বাধীনতার পর কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন দেখেছে পশ্চিমবঙ্গ, কিন্তু এই প্রথম রাজ্যের ক্ষমতার কেন্দ্র নবান্নে উঠল গেরুয়া পতাকা। রাজনৈতিক মহলের একাংশ এ ঘটনাকে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়; বরং বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির বড় রূপান্তর হিসেবেও দেখছেন।
ফল ঘোষণার পর থেকেই কলকাতা থেকে জেলা—সব জায়গায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়েছে। ঢাক, আবির, মিছিল আর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে বিভিন্ন এলাকা। বিজেপি নেতৃত্ব এ জয়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে দাবি করেছে। দলের শীর্ষ নেতারা বলেছেন—এটি শুধু একটি নির্বাচনি জয় নয়, এটি বাংলার মানুষের পরিবর্তনের রায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ফলের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ভাঙন তৈরি হলো। একসময় যে বাংলাকে বাম রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি বলা হতো, পরে যা তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যে চলে যায়, সে বাংলাতেই বিজেপির এ উত্থান জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
শ্যামাপ্রসাদের হাত ধরে পথচলা শুরু
১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচনে তৎকালীন কলকাতা দক্ষিণ-পূর্ব আসনে জেতেন ব্যারিস্টার রাজনীতিবিদ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। এর মধ্যে তিনি আরএসএসের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন ভারতীয় জনসংঘ। সেই সংঘের হাতে গড়া বিজেপির বঙ্গবিজয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
১৯৯১ সালে বিধানসভা ভোটে বাংলার ২৯১ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি। সেবার ১১.৩৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল তারা। সেই সময় যা চমকপ্রদ। আসলে রামমন্দির আন্দোলনের হাওয়া ঢুকেছিল বঙ্গেও। কিন্তু একা কি বাংলা জয় সম্ভব? ১৯৯৮ সালে নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলালেন অটল-আদবানি। প্রথমবার লোকসভা আসনে জয় আসে বিজেপির। ভোটের হার ১০.২ শতাংশ। ২০০১ বিধানসভা ভোটে বিজেপির সঙ্গে জোট হয়নি তৃণমূলের। বিজেপির ভোটের হার কমে হলো ৫.৬ শতাংশ। ২০০৬ সালে আবারও তৃণমূলের সঙ্গে জোট। সাফল্য এলো না। ২০১১ সালে কংগ্রেসের গাঁটছড়া বাঁধল তৃণমূল। বাংলায় পরিবর্তন। সেটাই যেন টার্নিং পয়েন্ট হলো।
২০১৪ সালে লোকসভা ভোটে দুই এমপি পেল বিজেপি। এরপর ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। বাংলায় প্রথমবার তিন বিধায়ক পেল গেরুয়া শিবির। ভোটের হার ১০.৩ শতাংশ। তবে তখনো অনেকটা পথ বাকি। ২০১৯ লোকসভা ভোটে ১৮টি আসন জিতে বিরোধী পরিসর দখল করল বিজেপি। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট তাতে সিলমোহর দিল। ৭৭ জন বিধায়ক।
২০২৬ সালে এলো সেই ঐতিহাসিক জয়। শূন্য থেকে ক্ষমতা দখল। অঙ্গ (বিহার), কলিঙ্গের (ওড়িশা) পর বঙ্গেও গেরুয়াযুগ শুরু।
শ্যামাপ্রসাদের উত্তরাধিকার ও প্রতীকী গুরুত্ব
বিজেপির এ জয়ের সঙ্গে বারবার উঠে আসছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম। কলকাতার সন্তান, শিক্ষাবিদ এবং জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদকে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই তাদের আদর্শিক ভিত্তির অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরে। দলের নেতাদের বক্তব্য—যে বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি জনসংঘের বীজ বপন করেছিলেন, সেই বাংলায় আজ বিজেপি সরকার গঠন করল। ফলে এই জয়কে বিজেপি শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, আদর্শিক জয়ের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরছে। বাংলায় সরকার গঠনের আগের দিন বিজেপির চানক্যখ্যাত অমিত শাহ বলেছিলেন—শ্যামাপ্রসাদ যেখানেই থাকুন, মোদিকে আশীর্বাদ করছেন। ফল ঘোষণার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ও শুভেন্দু অধিকারীরা শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক বাসভবনে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। গতকাল শুভেন্দুর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শ্যামাপ্রসাদের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ড. মাখনলাল সরকারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন।
কীভাবে বদলাল বাংলার ভোটের সমীকরণ
এক দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত ভিত ছিল গ্রামীণ এলাকা, নারী ভোট এবং সংখ্যালঘু ভোট। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই সমীকরণে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
গ্রামীণ এলাকাগুলোতে বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তার গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বুথভিত্তিক সংগঠন শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা আগ্রাসী প্রচার চালায়। যুব সমাজের একাংশের মধ্যে বেকারত্ব এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অসন্তোষ বিজেপির পক্ষে গেছে বলেও মত বিশ্লেষকদের।
এ ছাড়া দুর্নীতি ইস্যুও এই নির্বাচনে বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প এবং স্থানীয় স্তরে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে সরব ছিলেন। বিজেপি সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে।
নারী ভোটার ও যুব সমাজের ভূমিকা
নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, নারী ভোটারদের একটি অংশ এবার পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। বিজেপি নারীদের আর্থিক সহায়তা, নিরাপত্তা এবং স্বনির্ভরতার প্রতিশ্রুতি সামনে রেখেছিল। অন্যদিকে, প্রথমবারের ভোটার এবং যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে বিজেপির প্রচার বিশেষ প্রভাব ফেলেছে। কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ, প্রযুক্তি এবং শিল্প বিনিয়োগ নিয়ে দলের প্রতিশ্রুতি তরুণ ভোটারদের একাংশকে আকৃষ্ট করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তৃণমূলের ধাক্কা
এ ফল তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য নিঃসন্দেহে বড় ধাক্কা। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা দলটি এবার ক্ষমতা হারাল। রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে, তৃণমূল কি আগামী দিনে নিজেদের সংগঠন পুনর্গঠন করতে পারবে, নাকি বিজেপি আরও শক্ত ভিত তৈরি করবে বাংলায়।
জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠন জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বাংলা দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য। লোকসভা নির্বাচনে দলটি আগেই শক্তি বাড়িয়েছিল; কিন্তু সরকার গঠন ছিল সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
এই জয়ের ফলে পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রভাব আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিরোধী জোটের রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘বাংলার ফল শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচন নয়, এটি আগামী জাতীয় রাজনীতির দিকনির্দেশও দিতে পারে।’
সামনে কী চ্যালেঞ্জ
ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্প বিনিয়োগ আনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা—সবই নতুন সরকারের কাছে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। বাংলা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য আলোচিত। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো এবং প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে। এ ছাড়া কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্কও এখন নতুন মাত্রা পেতে পারে। বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করছে, একই রাজনৈতিক দলের সরকার থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে।
মানুষের প্রত্যাশা
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ পরিবর্তনের পক্ষে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, কেউ আবার সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কলকাতার এক তরুণ ভোটার বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন চেয়েছিলাম। এখন দেখতে চাই নতুন সরকার কতটা কাজ করতে পারে।’ অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়লে সবচেয়ে বেশি লাভ হবে সাধারণ মানুষের।’
ইতিহাসের নতুন অধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এ ফল নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বাধীনতার পর এই প্রথম গেরুয়া শিবির রাজ্যের ক্ষমতায় এলো। বিজেপির কাছে এটি আদর্শিক ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই বড় জয়। অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে এটি আত্মসমালোচনা এবং নতুন কৌশল তৈরির সময়। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির জন্মভূমিতে বিজেপির এ উত্থান তাই শুধু একটি নির্বাচনি ফল নয়; বরং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।