

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় জড়িতদের নাম প্রকাশ পেয়েছে। অভিযুক্তদের তালিকায় আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশের ১০ জন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আদালতে দেশি-বিদেশি ৬৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হবে। বাংলাদেশি যারা এই আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত তারা যেন পালিয়ে যেতে না পারেন, সে জন্য গোয়েন্দা নজরদারি করবে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আদালতে আবেদনের বিষয়টিও ভাবা হচ্ছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মামলাটির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চার্জশিটে কাদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তাদের নাম প্রকাশ্যে চলে আসায় জড়িতরা পালিয়ে যেতে পারেন। সে জন্য তাদের অবস্থান শনাক্ত করে নজরদারি করা হবে। আদালতে চার্জশিট দাখিলের পর গ্রেপ্তারসহ অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার (তখনকার হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮১০ কোটি টাকা) চুরি হয়। সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের এই অর্থ হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। বাংলাদেশ ব্যাংক ঘটনার এক দিন পর চুরির তথ্য জানতে পারলেও তা গোপন রাখে আরও ২৪ দিন। বিষয়টি তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় ৩৩তম দিনে। আর ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি।
তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক দশক তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিলের দ্বারপ্রান্তে সিআইডি। চার্জশিট দাখিলের আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে মামলার কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আইনি পরামর্শ পাওয়ার পরই আদালতে চার্জশিটটি দাখিল করা হবে। এ জন্য কত দিন লাগবে, তা এখনও বলতে পারেননি কর্মকর্তারা।
কালবেলার হাতে থাকা নথি অনুযায়ী, আসামির তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ ১০ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। এ ছাড়া ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, ভারত ও উত্তর কোরিয়ার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে আসামির তালিকায়। ফরেনসিক প্রতিবেদন, ফিলিপাইনের এমএলএআর, এফবিআই রিপোর্ট; জাপান, ভারতের সুপারিশ; শ্রীলঙ্কা থেকে অর্থ ফেরতের রেকর্ড, সুইফটের তথ্য, তদন্তের ডকুমেন্টারি এভিডেন্স ও ১৬১ ধারায় নেওয়া জবানবন্দির ভিত্তিতে জড়িতদের চিহ্নিত করেছে তদন্ত কর্মকর্তারা।
সিআইডির চূড়ান্ত করা চার্জশিটে আতিউর রহমান ছাড়াও ওই সময়ের ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সভাপতি আনিস এ খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক কে এম আবদুল ওয়াদুদ, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক রেজাউল করিম, তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক মেজবাউল হক, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের সাবেক উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা, ডিপার্টমেন্ট অব কারেন্সি ম্যানেজমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. সুলতান মাসুদ আহম্মেদ, গভর্নর সচিবালয়ের মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবুল কাশেমের নাম রয়েছে। বাকিরা ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, উত্তর কোরিয়া, জাপানের নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান।
মামলাটির তদন্ত শেষ জানিয়ে সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডিআইজি আলি আকবর খান কালবেলাকে বলেন, চার্জশিট দাখিলের পর স্বাভাবিকভাবে আমরা যেভাবে পদক্ষেপ নেই, সেভাবেই নেওয়া হবে। যদি কাউকে গ্রেপ্তারের প্রয়োজন থাকে সেই ব্যবস্থা আমরা নেব।
জড়িতরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হবে কি না জানতে চাইলে সিআইডি প্রধান বলেন, সাধারণভাবে আসামিদের পালানোর সম্ভাবনা থাকলে আদালতের আদেশ নিয়ে দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এই মামলার ক্ষেত্রে সেটার প্রয়োজন হলে তাও করা হবে।