

সন্তানের জন্মের ঠিক পরের মুহূর্তটা। চারদিকের সব কোলাহল ছাপিয়ে হঠাৎ ভেসে আসে এক চিলতে কান্নার আওয়াজ। ছোট্ট, নরম তুলতুলে শিশুটিকে কোলে নেন বাবা। পৃথিবীর সব রুক্ষতা ভুলে একজোড়া শক্ত হাত পরম মায়ায় কাঁপতে শুরু করে। একটা পুঁচকে, নরম আঙুল এসে আলতো করে ছুঁয়ে দেয় বাবার হাত। ব্যস, সেদিন থেকে নিজের অজান্তেই একজন পুরুষের ‘বাবা’ নামের এক অলিখিত সনদে দস্তখত হয়ে যায়। নিজের খোলস ভেঙে একজন মানুষ কখন যে কেবলই ‘কারও বাবা’ হয়ে উঠলেন, তা সমাজ দেখল না, সন্তানও হয়তো সবটা টের পায় না নিজের সন্তান হওয়ার আগে।
সন্তান জন্মের পর থেকে বার্ধক্যের শেষ সীমানা পর্যন্ত বাবা মানে তো এক অদৃশ্য চাদর। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে যে চাদর সন্তানকে আগলে রাখে পরম মমতায়। সন্তান যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, বাবা তখন তার মেরুদণ্ড। সন্তান যখন প্রথম আলো দেখে, বাবা তখন তার অন্ধকার তাড়ানো প্রদীপ। দিন কেটে যায়, রাত ফুরোয়—বাবার লড়াইয়ের চাকা থামে না। ভাঙা জুতো, মলিন শার্ট আর কপালের কুঁচকে যাওয়া চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে সন্তানের একটা ভালো জামা আর একটু ভালো-মন্দের জোগান। বাবাদের কোনো ক্লান্তি থাকতে নেই বাবাদের কোনো অসুখ করতে নেই—এ এক অদ্ভুত অলিখিত নিয়মে তারা নিজেদের সঁপে দেন নিয়তির হাতে।
অথচ এই অসামান্য ত্যাগের উপাখ্যান অলক্ষ্যেই থেকে যায়। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়তো এটাই যে, বাবারা তাদের সব ভালোবাসা ঢেলে দেন নিঃশব্দে। মায়ের আঁচলের মতো বাবার ভালোবাসা দৃশ্যমান নয়, তা লুকিয়ে থাকে শাসনের আড়ালে, গম্ভীর কণ্ঠস্বরের পেছনে। ‘সন্তান বড় হয়, ডানা মেলে আকাশে ওড়ে। আর বাবা? বাবা ক্রমশ ছোট হতে থাকেন, সংকুচিত হতে হতে একদিন ঘরের কোণের এক চিলতে চেয়ার বা বিছানায় আশ্রয় নেন।’
বড় অদ্ভুত এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে যায় দুজনের মাঝে। রক্ত এক, প্রাণ এক, অথচ আবেগের আদান-প্রদানে এক মহাসমুদ্রের দূরত্ব। সন্তান হয়তো এক বুক ভালোবাসা নিয়ে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়; কিন্তু এক অদ্ভুত সংকোচে বলতে পারে না ‘বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি।’ বাবাও হয়তো ঝাপসা চোখে সন্তানের দিকে তাকিয়ে থাকেন, মাথায় হাত রেখে বলতে চান ‘তুই-ই তো আমার সবরে জাদুধ’; কিন্তু ঠোঁট দুটো কেঁপে ওঠে, শব্দ আর বাইরে আসে না। এই না-বলা কথাগুলোর ভারেই সম্পর্কটা একসময় গুমরে মরে।
সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়টা আসে তখন, যখন সেই আজীবন লড়াই করা মানুষটার শরীরটা আর চলে না। যে হাতটা একসময় সন্তানকে আগলে ধরে বিশ্বজয়ের সাহস দিত, সেই হাতটা যখন বার্ধক্যে কাঁপতে শুরু করে, তখন অনেক সন্তানই ভুলে যায় সেই সোনালি অতীত। যে বাবা নিজের যৌবন, স্বপ্ন, সুখ সবকিছু সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য বন্ধক রেখেছিলেন, শেষ বয়সে এসে তিনি বড্ড একাকী হয়ে পড়েন। বিনিময়ের খাতায় তখন জমা হয় কেবল অবহেলা আর দীর্ঘশ্বাস।
তবুও, বাবা তো বাবাই। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বাবারা সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগের আগ পর্যন্ত তারা সন্তানের মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ান। বাবা চলে যান, কিন্তু রেখে যান তার সেই আজন্ম ছায়া। সন্তান যখন নিজে বাবা হয়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মলিন মুখের দিকে তাকায়, তখন সে বুঝতে পারে- এই তো সেই মুখ, এই তো সেই চোখ, যা একসময় তাকে পৃথিবীর সব ঝড় থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
বাবা এক অমোচনীয় লেপ্টে থাকা নাম। যা মৃত্যুর পরও সন্তানের অস্তিত্বে চিরকাল জীবন্ত থাকে। অবহেলায় নয়, ভালোবাসায় আর শ্রদ্ধায় বেঁচে থাকুক পৃথিবীর সব বাবার নীরব লড়াই।