শফিকুল ইসলাম মালয়েশিয়া থেকে
প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা অন্যের দেশ গড়তে পারলে নিজেরটাও পারব

আমরা অন্যের দেশ গড়তে পারলে নিজেরটাও পারব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা একসঙ্গে দুটি দেশ গড়ার কাজ করছেন। একটি হলো, কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করছেন। অন্যটি হলো, যেই দেশে তারা থাকেন সেই দেশটি। গতকাল রোববার রাতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে এক সুধী সমাবেশে অংশ নিয়ে প্রবাসীদের উদ্দেশে তিনি এ মন্তব্য করেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী এবং মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমরা যদি অন্য একটি দেশ গড়তে পারি, তাহলে নিজের দেশ গড়তে পারব না কেন? এ ক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে এসে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এদিকে গতকাল স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইট কুয়ালালামপুরের বুঙ্গা রায়া কমপ্লেক্সে এক্সক্লুসিভ ভিভিআইপি টার্মিনালে অবতরণ করে। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী ড. জুলকিফলি হাসান এবং তার সহধর্মিণী। ছোট শিশু মাইসা নুর আইশা প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রী এবং তার সহধর্মিণীকে জানানো হয় লালগালিচা সংবর্ধনা এবং দেওয়া হয় গার্ড অব অনার। সুসজ্জিত বাহিনীর দেওয়া গার্ড অব অনারের সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এ সময় বাংলাদেশ হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী ও ডেপুটি হাইকমিশনার সাহানারা মনিকা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও শাংগ্রি লা হোটেল পর্যন্ত ৫০ মিনিটের সড়কপথ বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকায় সজ্জিত করা হয়।

সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়ার পর বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ মোটর শোভাযাত্রা সহকারে কুয়ালালামপুরের ‘শাংগ্রি লা’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়; প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীসহ অন্য সফরসঙ্গীরা এই হোটেলে থাকবেন। এদিকে নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে হোটেল শাংগ্রিলায় জড়ো হন প্রবাসী অসংখ্য বাংলাদেশি। এর পর স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টার দিকে হোটেলে এক সুধী সমাবেশে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি প্রকৌশলী বাদলুর রহমান খান ও সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ স্থানীয় পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী, প্রবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী, শ্রমিকসহ মালয়েশিয়া হাইকমিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সুধী সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের অনেকগুলো সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ড. আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা হবে। বিশেষ করে প্রায় দুই হাজার প্রবাসী, যারা দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে আটকা পড়েছেন সে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব।

মালয়েশিয়া প্রযুক্তি খাতে ভালো উন্নতি করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি যে, মালয়েশিয়া সেমিকন্ডাকটর, কম্পিউটার বা আইটি—এই খাতে বেশ ভালো করছে। আমরা মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণ জানাব, যাতে তারা আরও ছোট ছোট ইন্ডাস্ট্রিসহ প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন। আমরা একটি জায়গায় আবদ্ধ থাকতে চাই না।

তারেক রহমান বলেন, কোনো শ্রমিক যাতে অদক্ষ অবস্থায় বিদেশে না যায়, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দক্ষতা অর্জন করেই বিদেশে যেতে হবে। এ সময় তিনি শিক্ষা সিলেবাসে একটি করে আলাদা ভাষা শেখার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা শেখার ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে সর্বমোট ছয়টি ভাষা শেখার ওপর আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। আশা করি, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এসব ভাষা শেখার জন্য দক্ষ শিক্ষকের অপ্রতুলতার কথাও জানান তারেক রহমান।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর মালয়েশিয়ায় প্রথম সফরে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা একেএম শামসুল ইসলাম প্রমুখ। এ ছাড়া আছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান সরকার গঠনের পরপরই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান। সেই আমন্ত্রণেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক এই সফর। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন ও ভারতের পর মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী দেশ বাংলাদেশ। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে মালয়েশিয়া এগিয়ে আছে অনেক দূর। সেই মালয়েশিয়াকে প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা জানাবেন আজ সোমবার সকালে পুত্রাজায়ায় তার কার্যালয়ে।

সেখানে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম একান্ত বৈঠক এবং এর পরপরই উভয় দেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। দুই প্রধানমন্ত্রী পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা। এই সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে পর্যটন ও সংস্কৃতি বিষয়ক সহযোগিতা নিয়েও দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকে ঘিরে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সফরটি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং এতে দুই (২১ ও ২২ জুন) দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো বন্ধ ও সীমিত হয়ে থাকা শ্রমবাজারের জটিলতা দূর করা। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের বিশাল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বিগত দিনগুলোতে নানা আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতায় স্থবিরতা নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মামুন বিন আব্দুল মান্নান কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের পর প্রথম মালয়েশিয়া সফর করছেন, এটি কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শ্রমবাজার সিন্ডিকেট মুক্তভাবে চালু হবে এবং প্রবাসীদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে তিনি কিছু পদক্ষেপ নেবেন। বিশেষ করে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণ হবে।

কয়েকজন প্রবাসী আকুতি জানিয়ে বলেন, সিন্ডিকেট ভেঙে বিমান টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতে হবে। প্রবাসীদের রক্ত পানি করা টাকা যেন কোনো মধ্যস্বত্বভোগী লুটে নিতে না পারে, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ চাই। প্রবাসীদের মাঝে সবচেয়ে যে বিষয়টি প্রভাব ফেলে সেটি হলো—কেউ মারা গেলে তার লাশ দেশে পাঠানো নিয়ে। কেননা, মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবস্থায় কোনো প্রবাসী মারা গেলে তার মরদেহ দেশে পাঠানো নিয়ে পরিবারগুলোকে চরম ভোগান্তি ও আর্থিক অনটনে পড়তে হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের দীর্ঘদিনের দাবি, কোনো প্রবাসী মারা গেলে যেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে সর্বোচ্চ ৩ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে তার লাশ বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। তারা চান, প্রধানমন্ত্রী যেন এবারের সফরেই এই মানবিক দাবিটি পূরণের সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেন।

মালয়েশিয়া প্রবাসী ও সেখানকার যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মবিষয়ক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হাওলাদার কালবেলাকে বলেন, মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের এই বিশাল ত্যাগ ও অবদানের বিপরীতে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। কুয়ালালামপুরের বুকজুড়ে এখন একটাই সুর—প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে কাটবে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দুঃখ-দুর্দশা, আর উন্মোচিত হবে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, যাতে প্রবাসীদের মৃতদেহ তিন দিনের মধ্যে দেশে বিনা খরচে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সেইসঙ্গে বিমানের টিকিট ও জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে সব ধরনের সিন্ডিকেট যেন ভেঙে দেওয়া হয়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশকে বন্যার তথ্য দেওয়া অব্যাহত রেখেছে ভারত

সাজাপ্রাপ্ত আ.লীগ নেতা কিবরিয়া গ্রেপ্তার

আমির হামজাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দুদকে যুবদল নেতার আবেদন

বিশ্বকাপে প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন সেশনে অংশ নিলেন নেইমার

ট্রাম্পের কস্তানজা মতবাদ: বুদবুদের জগত, যেখানে তিনিই রাজা 

পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন

এমবাপ্পেকে ঠেকাতে ৩ গোলকিপার!

চুয়াডাঙ্গায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার

স্ত্রী-নবজাতক সন্তান হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হাজতি, মানবিক উদ্যোগ কারা কর্তৃপক্ষের

হত্যার পর ফেলে দেওয়া হয়েছিল নদীতে, ৬ দিন পর ভেসে উঠলো লাশ

১০

ইরানের তেল বিক্রির অনুমতি দিল যুক্তরাষ্ট্র

১১

হোয়াটসঅ্যাপ প্রধানের পদ ছাড়লেন ক্যাথকার্ট, দায়িত্বে কুনাল শাহ

১২

অস্ট্রিয়া-আর্জেন্টিনা ম্যাচে কে জিতবে, কী বলছে অপ্টা?

১৩

৯০ বছর বয়সেও লাল-সবুজের ফেরিওয়ালা আব্দুর রফ

১৪

বৃষ্টিতে ধসে পড়ল কালভার্ট, দুর্ভোগে ১৫ গ্রামের মানুষ

১৫

ফেনীতে ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কমিটি ঘোষণা 

১৬

তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরানো হলো মমতাকে, বিদ্রোহীদের নতুন কমিটি গঠন  

১৭

সাতক্ষীরায় শিক্ষা কর্মকর্তাকে ‘হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে

১৮

মাদ্রাসাশিক্ষকদের বেতন জুলাইতে পরিশোধ করা হবে: শিক্ষামন্ত্রী

১৯

মাজারের ৭০০ বছরের ‘রীতি ভাঙলেন’ ডিসি সারওয়ার

২০
X