

সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এজন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্পে আরও ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত জনবল ও যানবাহন আউটসোর্সিংয়ের ব্যয় মেটাতে এ অর্থ চেয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এতে ৯০৪ কোটি টাকার প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ২ হাজার ৮১৪ কোটি টাকার বেশি।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো এক চিঠিতে এ তথ্য উঠে এসেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের সংশোধিত কারিগরি সহায়তা প্রকল্প প্রস্তাব (আরটিএপিপি) অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নথি অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের চলমান ‘স্ট্রেনদেনিং সোশ্যাল প্রোটেকশন ফর ইমপ্রুভড রেজিলিয়েন্স, ইনক্লুশন অ্যান্ড টার্গেটিং (এসএসপিআইআরআইটি)’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এদিকে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে যুক্ত হওয়ায় জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য আলাদা প্রকল্প নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
মূল প্রকল্প অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮০১ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক ঋণ এবং ১০৩ কোটি টাকা সরকারি অর্থায়ন ছিল। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির কারণে ব্যয় বেড়ে ২ হাজার ৮১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় দাঁড়াচ্ছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৯০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা মূল প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ২১১ শতাংশ বেশি।
প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ফ্ল্যাগশিপ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে দেশব্যাপী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য অতিরিক্ত জনবল ও যানবাহন আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পে নতুন কার্যক্রম যুক্ত করা হচ্ছে। আর এ কর্মসূচির অপারেশনাল ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বহনের জন্য ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান প্রকল্প নথি অনুযায়ী, এসএসপিআইআরআইটির মূল লক্ষ্য ছিল দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক করা। প্রকল্পের আওতায় জাতীয় ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি তৈরি, ভাতা ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর তথ্যভান্ডার গঠন এবং জীবিকা উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা ছিল।
প্রকল্পের মাধ্যমে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচন আরও স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পাশাপাশি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কার্যক্রমও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এখন সেই প্রকল্পেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যুক্ত হওয়ায় প্রকল্পের কর্মপরিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূল প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার। ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি তৈরির মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্রদের চিহ্নিত করা, ভাতা কর্মসূচির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানমুখী সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন প্রকল্পের বড় অংশ ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হলে মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ উল্লেখ করা হলেও অতিরিক্ত ১ হাজার ৯১০ কোটি টাকার বিস্তারিত খাতভিত্তিক হিসাব চিঠিতে নেই। ফলে কতজন জনবল নিয়োগ করা হবে, কতটি যানবাহন নেওয়া হবে এবং কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে—তা স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উন্নয়ন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রকল্প অনুমোদনের মাত্র এক বছরের মধ্যে ২১১ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রকল্প পরিকল্পনা ও চাহিদা নিরূপণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এসএসপিআইআরআইটি মূল প্রকল্পটি অনুমোদনের আগেও এর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। প্রকল্প প্রস্তাবে শুধু পরামর্শক সেবার জন্য প্রায় ১৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রাখা হয়। এর মধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১৭৩ কোটি টাকা এবং আটজন ব্যক্তিগত পরামর্শকের জন্য ২১ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল। কয়েকজন পরামর্শকের মাসিক পারিশ্রমিক ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা তখনো দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা বিতরণ প্রকল্পে এত বড় অঙ্কের পরামর্শক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই, ডাটাবেজ ব্যবস্থাপনা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়নেই অতিরিক্ত জনবল ও যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা দেখানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশন ও ইআরডির পর্যালোচনায় রয়েছে। অনুমোদন পেলে সামাজিক সুরক্ষা সংস্কারের জন্য নেওয়া প্রকল্পে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি যুক্ত হবে এবং সেইসঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও তিন গুণের বেশি বেড়ে যাবে।