হুমায়ূন কবির
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৯ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কতটা সফল

শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কতটা সফল

১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেড়ে নেয় প্রায় দুই কোটি মানুষের প্রাণ। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষ। পৃথিবীকে যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষার জন্য ১৯২০ সালে গঠিত হয় জাতিপুঞ্জ (লিগ অব নেশনস)। প্রথম দিকে সংগঠনটি বেশ কিছু বৈশ্বিক সংকট মেটাতে পারলেও ১০ বছরের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৩৯ সালে এ গ্রহ জড়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। সংগঠনটির ব্যর্থতায় হতাশ বিশ্ববাসী অনুভব করে নতুন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার সেই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই বৈশ্বিক সংগঠনের সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। সেখানে ২৩ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ও ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ বিতর্কে অংশ নিচ্ছেন ১৪০টি বেশি দেশের রাষ্ট্রনেতারা। কিন্তু বর্তমান বিবদমান বিশ্বে জাতিসংঘের হাল কী, নিজেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সংস্থাটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে—সেসব বিষয় নিয়ে লিখেছেন হুমায়ূন কবির

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদকে বলা হয় বিশ্বের আইন পরিষদ। বিশ্বের সব দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এখানে প্রায় সব বৈশ্বিক প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে। আর এ সংস্থার বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনকে বলা হয় বিশ্বের ‘টকিং শপ’। সেই ‘কথা বলার দোকান’-এর ৮০তম বার্ষিক অধিবেশন শুরু হয়েছে নিউইয়র্কে।

জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৯৩টি সদস্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন, অংশ নেবেন। মূল অধিবেশনে ভাষণের বাইরে আরও হাজারটা বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হবে। এখানে হাজারো প্রতিশ্রুতি এলেও তা কার্যকর হয় না।

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আশা করা হয়েছিল এই বিশ্বসংস্থাটি পৃথিবী থেকে যুদ্ধ, অনুন্নয়ন ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঠেকাবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যে দেশগুলো জার্মানি ও তার মিত্রদের পরাস্ত করে তারাই এ সংস্থা গঠনের আসল চালিকাশক্তি। জাতিসংঘকে নিয়ে আশা ও উৎসাহের সেটাই আসল কারণ। কিন্তু খুব বেশি দিন লাগল না দেশগুলোর বন্ধুত্বে চিড় ধরতে। শুরু হয়ে গেল পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই। যারা যুদ্ধ ঠেকাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দেখা গেল তারাই যুদ্ধ বাধাতে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত। পৃথিবীকে এক করার বদলে তাকে বিভক্ত করে যার যার প্রভাব বলয়ে আনাই তাদের আসল লক্ষ্য।

এরপর ৮০টি বছর কেটে গেছে। অবস্থা বদলায়নি; বরং বহুগুণে অবনতি ঘটেছে। একটা জিনিস লক্ষ্য করুন, পাঁচটি দেশকে তাদের সার্বিক গুরুত্বের কারণে এই সংস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ‘ভেটো’ প্রদানের অধিকার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, নিজেদের মিত্রদের রক্ষা ও স্বার্থ রক্ষায় সব সময় দেওয়া হচ্ছে ভেটো। এমনকি এই ‘অসীম’ ক্ষমতার অধিকারী দেশগুলোর অন্য কোনো সার্বভৌম দেশে হামলার করার সুযোগ নেই, শুধু তাদের ভূমিকা শান্তিরক্ষায় সমঝোতা করার। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া বারবার প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা করেছে।

কার্যকারিতা হারাচ্ছে জাতিসংঘ

কোনো সন্দেহ নেই, এই বিপদের কারণ বিশ্বের বড় রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই তৈরি করেছে। একটা উদাহরণ দিই। ২০২২ সালে প্রতিবেশী ইউক্রেন আক্রমণের মাধ্যমে জাতিসংঘের অন্যতম স্থপতি রাশিয়া—অর্থাৎ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেরাই সংস্থাটির প্রতি বুড়ো আঙুল দেখায়। জাতিসংঘ সনদের একটি প্রধান প্রতিশ্রুতিই হচ্ছে—কোনো দেশ, তা সে ছোট বা বড় যা-ই হোক, কোনো অবস্থাতেই অন্য কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হয়, এমন কাজ করবে না। রাশিয়া ঠিক সে কাজটি করে বসে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো তাদের যে কোনো বিবাদ মেটাতে জাতিসংঘের বিরোধ-নিরোধন প্রক্রিয়া ব্যবহার করবে, জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরের সময় তারা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও ভেনেজুয়েলায় হামলা করেছে। ইসরায়েলের লাগামহীন আগ্রাসনে অন্ধ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। স্পষ্টত যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জাতিসংঘে প্রতিশ্রুত পথে এগোয়নি। জাতিসংঘ যে এখন নখদন্তহীন একটি পোষা বিড়াল মাত্র, তার এক বড় কারণ এ সংস্থাটিকে এড়িয়ে বিশ্বের দেশগুলো যে যার মতো ছোট ছোট জোট গঠন করে নিয়েছে। বিশ্বের তিন মোড়ল—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া—তাদের নেতৃত্বে নানা জোট গড়ে তুলেছে।

জাতিসংঘ যে ক্রমেই তার কার্যকারিতা ও প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে, তার এক বড় কারণ এই সংস্থা বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে বা বদলাতে ব্যর্থ হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদের দিকে তাকান। অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই পরিষদের ভূমিকা সবচেয়ে বড়। যে পাঁচটি দেশ সেই ১৯৪৫ থেকে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো অধিকার নিয়ে বসে আছে, তার তিনটিই ইউরোপের।

ফ্রান্স বা যুক্তরাজ্য একসময় বিশ্বশক্তি ছিল, এখন তারা নিজেদের অতীতের ছায়ামাত্র। তাহলে কী হবে? বাস্তবতা মেনে সরে দাঁড়াতে বললে তারা কখনোই রাজি হবে না। আফ্রিকা মহাদেশ বা আরব দেশগুলো থেকে এই পরিষদে কোনো স্থায়ী সদস্য নেই। সবাই এ কথা মানেন, জাতিসংঘকে ঢেলে সাজাতে হবে, কিন্তু ঢেলে সাজাতে হলে সবার আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের সম্মতি। সেই সম্মতিও আসবে না, অচলাবস্থারও নিরসন হবে না। অথচ সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন বিশ্বের প্রয়োজন একটি কার্যকর জাতিসংঘ।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিয়ের মধ্যে প্রচলিত ৩০ কুসংস্কার

রাজধানীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ

‘খালে ময়লা ফেলা বন্ধ না করলে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে না’

রোনালদোর চেয়ে মেসি কেন সেরা, ব্যাখ্যা দিলেন ডি মারিয়া

বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু

কাফনের কাপড় বেঁধে যুবলীগের ৫৮ সেকেন্ডের মিছিল

মোহাম্মদপুরে অভিযান, বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৬

মেয়ের বাবা হলেন শাকিব খান

রাতে মাঠে নামছে বাংলাদেশ-সান মারিনো, আলোচিত ম্যাচের ১০ তথ্য

হোমিওপ্যাথির পক্ষে পোস্ট করে তোপের মুখে আনুশকা শর্মা

১০

ভারতকে হারিয়ে হ্যাটট্রিক শিরোপা জিততে মরিয়া বাংলাদেশ

১১

দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১

১২

পানির লাইন মেরামতের সময় বিদ্যুৎস্পর্শে বাবা-ছেলের মৃত্যু

১৩

হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

১৪

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভাসানী জনশক্তি পার্টির বিবৃতি

১৫

তরুণকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষককে গণপিটুনি

১৬

‘রকস্টার’ উন্মাদনার মাঝেই ‘সোলজার’ নিয়ে শাকিবের নতুন চমক

১৭

পুতিনকে বৈঠকের প্রস্তাব জেলেনস্কির, কী বলছে ক্রেমলিন

১৮

ফ্রান্সের পরাজয়ে বড় সুখবরের সঙ্গে দুঃসংবাদও পেল আর্জেন্টিনা

১৯

বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় টেইলর সুইফট, সম্পদ ছাড়াল ২ বিলিয়ন ডলার

২০
X