

ডাগআউটে একজন কোচের সিদ্ধান্ত যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতির মতো—ভুল হলে ফেরার পথ থাকে না। লিওনেল স্কালোনি এখন ঠিক তেমনই দ্বিধার মুখে দাঁড়িয়ে, সামনে দুটি পথ, দুটিই ঝুঁকির। মিশরের বিপক্ষে মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তনের একাদশই কি আবার নামাবেন কোচ, নাকি বদলে দেবেন কৌশলের ছক!
কানসাস সিটিতে রুদ্ধদ্বার অনুশীলন চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি, কিন্তু বাতাসে ভাসছে গুঞ্জন। স্কালোনি নিজের আট বছরের কোচিং জীবনে ১০১ ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুই প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একাদশ পরের ম্যাচে অপরিবর্তিত রেখেছেন। ২০১৯ কোপা আমেরিকার নকআউটে ভেনেজুয়েলা ম্যাচের পর সেমিফাইনালে ব্রাজিল ম্যাচে এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালের পর ফাইনাল ম্যাচে। এবার সেই ব্যতিক্রমই হয়তো ঘটতে চলেছে। একজন কোচ আট বছর ধরে নিজের হাতে গড়া দর্শনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চলেছেন কি না, তা নিয়ে গোটা আর্জেন্টিনা এখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।
কেন এই ভাবনা? কারণ দল ভালো খেলেছে, খেলোয়াড়েরা শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। আটলান্টার রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর সাধারণ পেশির টান ছাড়া বড় কোনো চোট নেই। রক্ষণে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় শোধরানো দরকার, যেখান দিয়ে মিশর বিপদ তৈরি করেছিল। তারপরও কাঠামো ভাঙার প্রয়োজন নেই বলেই মনে করছেন কোচ।
সুইজারল্যান্ড মিশরের চেয়ে অনেক বেশি সুসংগঠিত, খানিকটা যেন অস্ট্রিয়ার ছায়া বহন করে। টেকনিক্যাল মানের দিক থেকে দলটি এক ধাপ এগিয়ে। প্রতিটি পাস, প্রতিটি মুভমেন্ট যেন হিসাব কষে সাজানো এক ঘড়ির কাঁটা। যেখানে বিশৃঙ্খলার কোনো জায়গা নেই, শুধু নিখুঁত জ্যামিতি। এমন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামান্যতম শৈথিল্যও পাল্টে দিতে পারে ম্যাচের রং। তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা, কুড়ি বছর বয়সী প্রতিভাবান ইয়োহান মানজাম্বি, চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকার সম্ভাবনাই প্রবল, যা আর্জেন্টিনার জন্য স্বস্তির এক নিঃশ্বাস। এটি অবশ্য আত্মতুষ্টির কোনো কারণ নয়, কেননা একজন তারকার অনুপস্থিতি কখনো কোনো সুসংগঠিত দলকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করে দেয় না।
নকআউট পর্ব, বিশেষত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল, সবসময়ই আলাদা এক মনস্তত্ত্ব দাবি করে, যেখানে যুক্তির চেয়ে অভিজ্ঞতা আর অন্তর্দৃষ্টি বড় হয়ে ওঠে। রদ্রিগো ডি পলকে একাদশ থেকে বাদ দেওয়ার কথা কল্পনা করাই কঠিন, যদিও টানা দুই ম্যাচে এই মিডফিল্ডারের নৈপুণ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কেপ ভার্দে ও মিশরের বিরুদ্ধে ডি পলকে তুলে নিতে হয়েছে। কিন্তু মেসিকে খেলায় যেভাবে তিনি প্রেসিং আর গেম রিডিংয়ে ব্যাক-আপ দেন, তার বিকল্প খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
রাইট ব্যাকেও একই টানাপোড়েন—মোলিনার ফর্মে ওঠানামা লক্ষণীয়। মন্তিয়েল ছিলেন মেসির সমতাসূচক গোলের পাস সরবরাহকারী, কিন্তু এই খেলোয়াড় এখনো নিজের সেরা ছন্দে ফেরেননি। নয় নম্বর জার্সির লড়াইও চিরন্তন এক প্রশ্ন তুলছে—হুলিয়ান আলভারেস এখন শারীরিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত। মাঠে নিজের সবটুকু ঢেলে দেওয়ার তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষা করছেন এ ফরোয়ার্ড।
প্রতিটি পজিশনেই যেন লুকিয়ে আছে ছোট ছোট নাটক, যা মিলেমিশে তৈরি করছে স্কালোনির বৃহত্তর দ্বিধার ছবি—একটি ছবি, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে জড়িয়ে আছে গোটা জাতির প্রত্যাশা আর ইতিহাসের ভার।