

চারদিকে শুধু অথৈ পানি। ঘরের আঙিনা, উঠান, পথঘাট সবকিছু তলিয়ে গেছে বন্যার পানিতে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে অবুঝ শিশুরা। খেলার ছলে কিংবা কৌতূহলবশত পানির কাছে চলে যাওয়ার কারণে যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।
এমনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে কক্সবাজারের পেকুয়া সদর ইউনিয়নের নন্দীরপাড়া গ্রামে। ঘরের দরজায় বসে বন্যার পানির দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল এক শিশু। কিছুক্ষণ পর হামাগুড়ি দিয়ে পানির দিকে এগিয়ে যেতেই দ্রুত তাকে কোলে তুলে নেন তার মা। মায়ের এই সতর্কতাই হয়তো সম্ভাব্য একটি দুর্ঘটনা থেকে শিশুটির জীবন রক্ষা করেছে।
শনিবার দুপুরে নন্দীরপাড়া গ্রামে দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দি করেন দৈনিক কালবেলার প্রতিনিধি দেলওয়ার হোসাইন।
বন্যাকবলিত এলাকায় প্রায় প্রতিটি পরিবারই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। অনেক ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ায় পরিবারগুলো বাঁশের তৈরি অস্থায়ী মাচা নির্মাণ করে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। তবে অভিভাবকরা ঘুমিয়ে পড়লে বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে কোনো শিশু মাচা থেকে নিচে নেমে গেলে মুহূর্তেই পানিতে পড়ে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এই শঙ্কা এখন প্রায় প্রতিটি পানিবন্দি পরিবারের নিত্যসঙ্গী।
এরই মধ্যে সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শনিবার রাতে পেকুয়া সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে মারা যায় ২১ মাস বয়সী শিশু মুশফিকুর রহিম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার সময় একপর্যায়ে সবার অগোচরে খাবারের বাটি হাতে ঘরের বাইরে চলে যায় সে। পরে বাড়ির সামনে জমে থাকা বন্যার পানিতে পড়ে যায়। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি করে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে স্থানীয়রা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকায় পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে বিষাক্ত সাপের উপদ্রব। ফলে শিশুদের পাশাপাশি পুরো বন্যাকবলিত জনগোষ্ঠীই এখন বহুমুখী স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়ে অভিভাবকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই শিশুদের একা পানির কাছে যেতে দেওয়া যাবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বন্যার সময় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রতিটি পরিবারের প্রথম দায়িত্ব। সামান্য অসতর্কতাও অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সচেতন মহলের মতে, বন্যার এই দুর্যোগে শিশুদের কখনোই একা রাখা উচিত নয়। প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব শিশুদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা এবং পানির কাছ থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা। কারণ, এক মুহূর্তের অসতর্কতায় ঝরে যেতে পারে একটি নিষ্পাপ প্রাণ। সচেতনতা ও সর্বোচ্চ সতর্কতাই পারে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে।