

পদ্মার চরজুড়ে আতঙ্কের নাম ‘কাঁকন বাহিনী’সহ ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার চরাঞ্চলে যুগের পর যুগ ধরে এদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা। কথা বলার আগেই গুলি—এ যেন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি কাঁকন বাহিনীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় তৎপর হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত রোববার পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএনের যৌথ অভিযানে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে ১১টি বাহিনীর ৬৭ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এসব বাহিনীর শীর্ষ নেতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে চরের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাঁকন বাহিনী পদ্মার চরের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। বাহিনীটির প্রধান হাসিনুজ্জামান কাঁকন, যিনি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার রায়চা গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৯৪ সালে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বেসরকারি চাকরি করার পর ২০০৭ সালে তিনি সৌদি আরবে যান। পরে দেশে ফিরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন এবং গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী। কাঁকনের বাহিনীতে বর্তমানে ৪০ জনের মতো সদস্য রয়েছে, যাদের কেউ অস্ত্রসহ তার সঙ্গে চরে থাকে, আবার কেউ দৌলতপুর, ভেড়ামারা, ঈশ্বরদী ও লালপুর এলাকায় অবস্থান করে বালুমহাল থেকে চাঁদা আদায় করে। বালু ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে তাদের চাঁদা দেন, কারণ চাঁদা না দিলে মাঝপদ্মায় বালুবাহী নৌযান আটকে রাখা হয়।
কাঁকন বাহিনী ছাড়াও পদ্মার চরে সক্রিয় রয়েছে মণ্ডল, টুকু, সাঈদ, লালচাঁদ, রাখি, শরীফ কাইগি, রাজ্জাক, চল্লিশ, বাহান্ন, সুখচাঁদ ও নাহারুল বাহিনী। এসব বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—পারস্পরিক দ্বন্দ্বে খুন, কৃষক-জেলে হত্যা, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র পাচার, অবৈধ অস্ত্রধারণ, নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের আশ্রয়দান, খড়ের মাঠ দখল এবং ডাকাতির মতো অপরাধ।
গত ২৭ অক্টোবর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, রাজশাহীর বাঘা ও নাটোরের লালপুরে সীমান্তবর্তী এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। ওই ঘটনায় কাঁকনসহ তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এরপর একযোগে অভিযানে রাজশাহীর বাঘা, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অভিযান চালিয়ে কাঁকন বাহিনীসহ ১১টি বাহিনীর ৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, ধারালো অস্ত্র, মাদক, নৌকা, স্পিডবোট ও মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। তবে কাঁকনসহ অন্য বাহিনীর প্রধানদের ধরা যায়নি।
গত ১১ জুন ঈশ্বরদীতে নদীতে অভিযান চালিয়ে কাঁকন বাহিনীর ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়। আবার ১৭ জুলাই সেনাবাহিনীর অভিযানে কাঁকনের ভায়রা মেহেফুজ সোহাগ, সদস্য আশরাফুল ইসলাম বাপ্পি ও রোকেয়া খাতুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেখান থেকেও অস্ত্র, মাথার খুলি, মাদক এবং টাকার ভাগাভাগির তালিকা উদ্ধার হয়। তবে কাঁকন তখনো ধরা পড়েননি।
রাজশাহীর বাঘার গড়গড়ি ইউনিয়নের এক বাসিন্দা বলেন, নিচপাড়া এলাকায় যে নতুন বসতি গড়ে উঠেছে, তার বাসিন্দাদের কেউ কেউ আগে লালচাঁদ ও পান্না বাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে তারা নিজে ‘খেত বাহিনী’ নামে মাদকের কারবারে যুক্ত। বছরে দুই-তিনবার সেখানে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। লাভলু বাহিনীর সদস্য আমজাদসহ অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা গেলে এলাকার মানুষ স্বস্তি পেত।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. শাহজাহান বলেন, অভিযান চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এরই মধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো।