

মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকরা কী পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার করেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, মিটারবিহীন গ্রাহকরা বেশি গ্যাস ব্যবহার করছেন। সে কারণে গ্যাসের সিস্টেম লস বাড়ছে এবং আর্থিক লোকসান হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিতরণ কোম্পানিগুলোর এ দাবি মানতে নারাজ।
এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) দিয়ে পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিইআরসি। গত বুধবার কমিশনের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিইআরসির সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বিষয়টি সম্পর্কে কালবেলাকে বলেন, মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকরা কতটুকু গ্যাস ব্যবহার করেন, তা পরীক্ষা করবে বুয়েট। এরপরই আমরা তিতাসের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। গ্যাস ব্যবহার নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, তারও অবসান হবে।
জানা গেছে, তিতাসের ওই আবেদনটি বিইআরসিতে জমা হয় ২০২৩ সালের মার্চ মাসে। আবেদনে তিতাসের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, মিটারবিহীন আবাসিক গ্রাহকদের নির্ধারিত পরিমাণ গ্যাসের বিল আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু এলাকায় মাসে অনেক বেশি গ্যাস ব্যবহার হয়ে থাকে। তিতাসের দাবি, মিটারবিহীন গ্রাহকরাই বেশি গ্যাস ব্যবহার করছেন, যার ফলে সিস্টেম লস বাড়ছে।
আবেদনে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি এক চুলার ক্ষেত্রে নির্ধারিত ৫৫ ঘনমিটার (৯৯০ টাকা) থেকে বাড়িয়ে ৭৬.৬৫ ঘনমিটার এবং দুই চুলার ক্ষেত্রে ৬০ ঘনমিটার (১০৮০ টাকা) থেকে বাড়িয়ে ৮৮.৪৪ ঘনমিটার নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়।
মূলত এই প্রস্তাবের পর থেকেই বিইআরসির সঙ্গে তিতাসের টানাপোড়েন শুরু হয়। বিইআরসি একটি অভ্যন্তরীণ কমিটির মাধ্যমেও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। সর্বশেষ গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিইআরসি, পেট্রোবাংলা ও তিতাসের যৌথসভায় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একটি সমীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় কাজটি বুয়েটকে দেওয়া হয়েছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ কালবেলাকে বলেন, আমরা নিজেরা পরীক্ষা করে দেখেছি, অনেক এলাকার মিটারবিহীন গ্রাহকরা মাসে ১০০ থেকে ১২০ ঘনমিটার পর্যন্ত গ্যাস ব্যবহার করছেন। অথচ বিল পাচ্ছি ৬০ ঘনমিটারের। বাকি অংশ সিস্টেম লস হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এতে লোকসান বাড়ছে। তাই আমরা বিইআরসির কাছে গ্যাসের নির্ধারিত পরিমাণ ও বিল বাড়ানোর আবেদন করেছি।
বিইআরসি ও তিতাস সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে প্রায় ৪৪ লাখ আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। অধিকাংশ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রিপেইড গ্রাহকরা গড়ে ৩০ ঘনমিটারের কম গ্যাস ব্যবহার করেন।
শুধু বর্তমান পরিসংখ্যানই নয়, ২০১৯ সালে বিইআরসি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) দিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে দেশের ছয়টি বিতরণ কোম্পানির ১৩ জেলার ১ হাজার ৫৪ জন আবাসিক গ্রাহকের ওপর জরিপ করা হয়।
ওই রিপোর্টে বলা হয়, এক চুলার প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকরা গড়ে ৩৫.৫ ঘনমিটার এবং দুই চুলার গ্রাহকরা গড়ে ৫৯.৩ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন। সব মিলিয়ে গড়ে ৫৭.৯ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন মিটার ব্যবহারকারীরা। আর মিটারবিহীন গ্রাহকরা গড়ে ৫৬ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন। যদিও তিতাস গ্যাস এই রিপোর্টের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আসছে।
বিইআরসি সর্বশেষ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির আদেশ দেয় ২০২২ সালের ৫ জুন। এর আগে গণশুনানির আয়োজন করা হয়। সেই সময় বিতরণ কোম্পানিগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারী গ্রাহকরা গড়ে এক চুলায় ৪০ এবং দুই চুলায় সর্বোচ্চ ৫০ ঘনমিটার গ্যাস ব্যবহার করেছেন।
এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এক চুলার জন্য নির্ধারিত ৭৩.৪১ ঘনমিটার এবং দুই চুলার জন্য ৭৭.৪১ ঘনমিটার কমিয়ে যথাক্রমে ৫৫ এবং ৬০ ঘনমিটার নির্ধারণ করা হয়।
বিইআরসির তৎকালীন সদস্য (গ্যাস, ২০২২) মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, তিতাস গ্যাসের দাবি সত্য নয়। আমার মনে হয়, বরং ৫০ ঘনমিটারের নিচে নির্ধারণ করা উচিত ছিল। তাদের (ওই সময়ে) প্রায় সাড়ে ৩ লাখ প্রিপেইড মিটার ছিল, সেখানে দেখা গেছে গড়ে ৪৫ ঘনমিটারেরও কম গ্যাস ব্যবহার হয়েছে। প্রিপেইড মিটারের বিলের তথ্য দেখলেই তা বোঝা যায়। এ বিষয়ে ‘রকেট সায়েন্স’ জানা দরকার নেই।