জাফর ইকবাল
প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষা ছাড়াই ৫৪ স্বজনকে নিয়োগ উপপরিচালকের

লুটপাটের আখড়া বিএভিএস
ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

বাড়ির কাঁচামরিচ থেকে শুরু করে ছেলের জুতা, বান্ধবীর উপহার, এমনকি পছন্দের মানুষকে দেওয়া গিফট—সব কিছুর বিলই জমা পড়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের খরচের খাতায়। প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ তুলেছেন নিজের ইচ্ছেমতো। খরচ শেষে গোঁজামিলের রসিদ বানিয়ে জমা দিয়েছেন দপ্তরে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকার-প্রশাসিত সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ভলানটারি স্টেরিলাইজেশনে (বিএভিএস) দীর্ঘদিন ধরে অবাধে চলছে এমন লুটপাট। এখানেই শেষ নয়, আপন ভাই, খালাতো ভাই, মামাতো ভাই এমনকি টাকার বিনিময়ে কাছের-দূরের অন্তত ৫৪ জন আত্মীয়স্বজনকে চাকরি দিয়েছেন কোনো ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই। এর মধ্যে নিজ জেলা নোয়াখালীর রয়েছে অন্তত ৩২ জন। স্বজনপ্রীতি, সরকারি অর্থ লোপাট, ভয়ভীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ এমন কোনো অপরাধ নেই—যা তিনি করেননি। কালবেলার অনুসন্ধানে এমন গুরুতর সব অভিযোগ পাওয়া গেছে বিএভিএস উপপরিচালক নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তথ্য বলছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি বিএভিএসের অর্থকে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত সংসার চালানোর তহবিল হিসেবে।

বিএভিএস পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সরকার প্রশাসিত সংস্থা, যা দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, পরিবারের জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং মা-শিশু সেবায় দেশব্যাপী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি শুরুতে ইউএসএইডের অর্থায়নে পরিচালিত হলেও ১৯৯২ সালে সরকারিভাবে পুনর্গঠনের পর এটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ১৮টির বেশি ক্লিনিক ও সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে। ডাক্তার নার্সসহ সব মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক কর্মচারী-কর্মকর্তা রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটিতে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসকের পরে প্রতিষ্ঠানটির হর্তাকর্তা উপপরিচালক নজরুল ইসলাম।

জানা যায়, ১৯৯৬ সালে সহকারী হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে নজরুল ইসলাম বিএভিএসে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে প্রশাসকদের বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা ও আওয়ামী লীগের নেত্রী স্ত্রীর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বাগিয়ে নেন একের পর এক পদোন্নতি; হয়ে যান অর্থ বিভাগের উপপরিচালক। এর পর থেকেই তার স্বেচ্ছাচারিতা চরমে পৌঁছায়।

নিয়োগে অনিয়ম: নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উপপরিচালক নজরুল ইসলাম তার নিজ জেলা ও আত্মীয়দের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছেন বিএভিএসকে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তার আপন ছোট ভাই মো. ইমামুল ইসলাম। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর ইমামুল ইসলামকে অস্থায়ী ভিত্তিতে সহকারী হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগপত্রে লেখা হয়, ‘বিএভিএসের বিভিন্ন ক্লিনিকে সহকারী হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার শূন্য পদে নিয়োগের লক্ষ্যে আপনার আবেদন ও পরবর্তী সময়ে প্রধান কার্যালয়ে সাক্ষাৎকার শেষে আপনাকে নোয়াখালী ক্লিনিকে সহকারী হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।’ এরপর ২০২৩ সালের ১২ জুন তাকে পদোন্নতি দিয়ে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা করা হয়। নজরুলের সহায়তায় নোয়াখালী ক্লিনিককে কার্যত ‘নোয়াখালী সমিতিতে’ পরিণত করেছেন ইমামুল। এ শাখায় মোট ৪২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে ৩২ জনই নোয়াখালীর বাসিন্দা। কালবেলার হাতে আসা এ তালিকায় রয়েছেন নজরুল ও ইমামুলের চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই, মামাতো ভাই-বোন, ভাতিজা, শালা, বন্ধুর আত্মীয় ও স্ত্রীর পক্ষের আত্মীয়রা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এমনকি ৫৬ বছর বয়সী নিজের মামাকেও পিআরও পদে চাকরি দিয়েছেন নজরুল। অভিযোগ রয়েছে, অনেকের কাছ থেকে চাকরির নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়েছেন নজরুলের ভাই ইমামুল ইসলাম শাহিন।

নোয়াখালীর বাসিন্দা ‘কোটায়’ নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন—মেডিকেল অফিসার ডা. তাসনিয়া ইসলাম, ডা. খালেদা ইয়াসমিন, কাউন্সেলর তাহমিনা আক্তার খানম, স্টাফ নার্স কামরুন নাহার, পিআরও মো. মোসলেম, ল্যাব টেকনিশিয়ান মো. সজ্জাদুর রহমান রাকিব, প্যারামেডিক নারগিস আক্তার, মো. নিজাম উদ্দিন, সুলতানা আক্তার, অর্পা রানী দাস, আবদুল কাদের জিলানী, কাজল রিয়া জুই, দিলরুবা শারমিন, মাহমুদা সুলতানা, অফিস সহকারী মো. মোশারুর আদনান, কম্পিউটার অপারেটর তিন্নি আক্তার, সাদিয়া ইসরাত মিম, রিসেপশনিস্ট নাসরিন আক্তার বৃষ্টি, রুবী আক্তার, নুসরাত জাহান, মো. রিয়াজ উদ্দিন, ওয়ার্ডবয় সাঈদ আল সাহাব, ইব্রাহিম খলিল, আলী রেজা ফরহাদ, আয়া জোছনা বেগম, সুমি আক্তার, সামছুন নাহার বেগম, পিয়ন জান্নাতুল ফেরদৌস, মো. মিরাজ হোসেন, অফিস সহায়ক সুমাইয়া আক্তার ও ক্লিনার আমজাদ হোসেন।

নজরুলের এ নিয়োগ সিন্ডিকেট সারা দেশেই বিস্তৃত। বগুড়া ক্লিনিকে প্যারামেডিক মো. নাছির উদ্দিন, সিলেটে প্যারামেডিক শারমিন আক্তার ও ক্লিনার কাম গার্ড সামছুল আলম, যশোরে অফিস সহাকীর কাম স্টোর কিপার মো. রকিবুল হাসান, স্টোর কিপার মো. ছাইফুল ইসলাম, অফিস সহায়ক রাকিব উদ্দিন, নরসিংদীতে প্যারামেডিক মো. মহিউদ্দিন, রাজশাহীতে স্টোর কিপার মো. সজিব উদ্দিন, চাঁদপুরে অফিস সহকারী কাম স্টোর কিপার মো. তাজুল ইসলাম, ভোলায় অফিস সহকারী মো. নাদিম হাসান, মিরপুরে নজরুল ইসলামের বাসার কাজের লোক (পিয়ন পদে) ফয়সাল আহম্মদ, মালিবাগে স্টোর কিপার মো. মারুফ ইসলাম ভুইয়া, অফিস সহকারী তাছলিমা আক্তার, প্যারামেডিক মো. ইমরান উদ্দিন জনি, সোনিয়া আক্তার ও গার্ড-কাম পিয়ন মো. আমিরুল ইসলাম, খুলনায় অফিস সহকারী কাম স্টোর কিপার মো. রফিকুল ইসলাম, প্যারামেডিক মো. আবদুর সাত্তার, পিয়ন মো. মামুনুর রশিদ ও জয়পুর হাটে অফিস সহকারী কাম স্টোর কিপার মো. ইব্রাহিম খলিলকে একইভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের নিয়োগপত্র রয়েছে কালবেলার হাতে, যেখানে প্রত্যেককেই নিজ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে লেখা হয়েছে।

বিএভিএসের বরাদ্দ বণ্টনেও দেখা গেছে চরম বৈষম্য। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নোয়াখালী শাখায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ২৯ লাখ ৫২ হাজার টাকা, অথচ পাশের জেলা চাঁদপুরে দেওয়া হয় মাত্র ৪১ লাখ ৫৮ হাজার টাকা।

নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত খরচের ফিরিস্তি আরও বিস্ময়কর। ২০২৪ সালের মে মাসের বাজার বিল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২৪ মে শুক্রবার কোরাল ও কাজলি মাছ এবং মুরগি কেনা বাবদ বিল করা হয়েছে ৭ হাজার ২৪০ টাকা। একই দিন ফল কেনা বাবদ ৪ হাজার ৫০ টাকা। এর ঠিক এক দিন পর আবারও ৮ হাজার ৯৮০ টাকার মাছ-মাংস এবং ৪ হাজার ২৫ টাকার মুদি বাজার করা হয় অফিসের টাকায়। পুরো মাসজুড়েই অফিসের টাকায় মন খুলে এভাবেই বাসার জন্য বাজার-সদাই করতেন নজরুল ইসলাম। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বন্ধুদের নিয়ে ভূরিভোজের আয়োজনও চলত প্রতিষ্ঠানের খরচে।

তথ্য বলছে, নজরুলের অনিয়মের ঢাল হিসেবে কাজ করতেন প্রধান কার্যালয়ের নিরীক্ষা শাখার হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মনির উদ্দিন, যিনি নজরুলের খালাতো ভাই। এ ছাড়া ভুয়া বিল পাসে সহায়তা করতেন ম্যানেজার ডা. রফিকুল ইসলাম। নজরুলের ডান হাত হিসেবে পরিচিত এ কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকত সব ভূতুড়ে বিলে।

আর্থিক লুটপাটের চিত্র এখানেই শেষ নয়।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিএভিএসের উপপরিচালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপে বিস্তারিত প্রশ্ন লিখে পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু

কাফনের কাপড় বেঁধে যুবলীগের ৫৮ সেকেন্ডের মিছিল

মোহাম্মদপুরে অভিযান, বিপুল পরিমাণ গাঁজাসহ গ্রেপ্তার ৬

মেয়ের বাবা হলেন শাকিব খান

রাতে মাঠে নামছে বাংলাদেশ-সান মারিনো, আলোচিত ম্যাচের ১০ তথ্য

হোমিওপ্যাথির পক্ষে পোস্ট করে তোপের মুখে আনুশকা শর্মা

ভারতকে হারিয়ে হ্যাটট্রিক শিরোপা জিততে মরিয়া বাংলাদেশ

দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ১

পানির লাইন মেরামতের সময় বিদ্যুৎস্পর্শে বাবা-ছেলের মৃত্যু

হামের উপসর্গে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

১০

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভাসানী জনশক্তি পার্টির বিবৃতি

১১

তরুণকে বলাৎকারের অভিযোগে শিক্ষককে গণপিটুনি

১২

‘রকস্টার’ উন্মাদনার মাঝেই ‘সোলজার’ নিয়ে শাকিবের নতুন চমক

১৩

পুতিনকে বৈঠকের প্রস্তাব জেলেনস্কির, কী বলছে ক্রেমলিন

১৪

ফ্রান্সের পরাজয়ে বড় সুখবরের সঙ্গে দুঃসংবাদও পেল আর্জেন্টিনা

১৫

বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় টেইলর সুইফট, সম্পদ ছাড়াল ২ বিলিয়ন ডলার

১৬

ভাঙা স্লিপারের ওপর দিয়েই ছুটছে ট্রেন

১৭

২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর তিন দফায় হামলা চালাল লেবাননের যোদ্ধারা

১৮

দেশের সংখ্যালঘুরা বিএনপির আমলেই সবচেয়ে নিরাপদে বসবাস করে : হুইপ দুলু

১৯

পঞ্চগড় সীমান্তে ১০ জনকে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির বাধা

২০
X