

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অমান্য করে আটতলার অনুমোদনের বিপরীতে ১১ তলা ভবন নির্মাণ করেছে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান। ফলে আবাসন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামের আবাসন খাতে যখন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নীতিগত সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে, তখনই একাধিক অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন ও প্রতারণার ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপারসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুর উদ্দিন আহমেদ। তিনি আসন্ন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নির্বাচনে ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’-এর হয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট (চট্টগ্রাম) পদে (ব্যালট নং-২২) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিজেই নিয়ম না মেনে চললেও স্বচ্ছ নীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন তিনি। এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপারস রিহ্যাবের সদস্যভুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রেহানা আক্তার, যিনি নুর উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী।
সরেজমিন জানা গেছে, নুর উদ্দিন আহমেদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘এমিটি অ্যাপার্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপার লিমিটেড’ নগরের লাভ লেইন এলাকার আবেদীন কলোনিতে ‘এমিটি সেলিম এনজেলিক’ নামে একটি ভবন নির্মাণ করেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শর্ত অনুযায়ী ভবনটি আটতলা পর্যন্ত নির্মাণের অনুমোদন পেলেও তা অমান্য করে ১১ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২ এবং সংশোধিত ১৯৮৭ অনুযায়ী অনুমোদনের বাইরে নির্মিত এ ভবন অবৈধ স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এরই মধ্যে ১১ তলা ভবনটিতে গ্রাহকদের কাছে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়েছে এবং সেখানে বসবাস শুরু হয়েছে। এতে ক্রেতাদের নিরাপত্তা ও আইনি ঝুঁকি নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি পরে আটতলার অনুমোদন বাতিল করে ১১ তলার জন্য নতুন করে, সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবেদন করার আগেই ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল। ২০২৪ সালে করা সেই আবেদন এখনো অনুমোদন পায়নি।
বিষয়টি নিয়ে নুর উদ্দিন আহমেদকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। একই বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান রেহানা আক্তারকে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি কল কেটে দেন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আবু ঈসা আনসারী বলেন, ‘সিডিএ এমিটি সেলিম এনজেলিক ভবনটিকে ১১ তলার অনুমোদন দেয়নি; ভবনটির জন্য আটতলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। যতটুকু জানি এ বিষয়ে এরই মধ্যে সিডিএর একটি টিম পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শনে ইমারত আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। নোটিশও দেওয়া হয়েছে।’
এ ছাড়া নুর উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগও রয়েছে। রিহ্যাব নির্বাচন বোর্ডের সচিবের সঙ্গে বল প্রয়োগ, খারাপ আচরণ ও অশালীন কথাবার্তার মাধ্যমে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরির অভিযোগে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে রিহ্যাব নির্বাচন বোর্ড (২০২৬-২০২৮)। রিহ্যাব নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. জহিরুল হক ভুঁইয়া স্বাক্ষরিত ওই নোটিশের স্বারক নং- রিহ্যাব/নি.বো./২০২৬/০৮। এর অনুলিপি রিহ্যাব নির্বাচন আপিল বোর্ড চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআই ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে। তবে তিনি এখনো ওই নোটিশের জবাব দেননি।
সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ করা ইমারত নির্মাণ আইন ১৯৫২-এর ৩ (১) ধারা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬-এর ৩ উপবিধির লঙ্ঘন। এ ধরনের অপরাধে আইনটির ১২ ধারা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড এবং অন্তত ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ আইন মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯-এর তপশিলভুক্ত হওয়ায় মোবাইল কোর্টেও বিচার করা সম্ভব। পাশাপাশি রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী কোনো প্রকল্প শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় নকশা ও অনুমোদনের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা বাধ্যতামূলক।
উল্লেখ্য, আবাসন খাতের অন্যতম শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নির্বাচন আগামী ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে। ‘প্রগতিশীল আবাসন ব্যবসায়ী পরিষদ’ প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা দূর করে স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে।