

প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদল ২০ শয্যা হাসপাতাল দুই দফা উদ্বোধনের পরও ১১ বছর ধরে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে হাসপাতালটি কার্যত পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম অযত্নে নষ্ট হচ্ছে, আর দিরাই, জগন্নাথপুর ও শান্তিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ছয়টি দুর্গম ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে।
সরেজমিন দেখা যায়, হাসপাতালের ইনডোর ইউনিটের প্রতিটি কক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ। রোগীদের জন্য বরাদ্দ স্টিলের বেড, মেট্রেস ও অন্যান্য আসবাবপত্র একটি কক্ষে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। অনেক আসবাবপত্রে এরই মধ্যে মরিচা ধরেছে। স্টোররুমে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে সরকারি বরাদ্দের গজ, ব্যান্ডেজ, সিরিঞ্জ, তুলাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী। মূল্যবান এয়ার কন্ডিশনারগুলোও এখন পাখির বাসায় পরিণত হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে জগদল গ্রামে তিন একর জমির ওপর হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ শেষ হয়। ২০১৩ সালের ২৩ অক্টোবর তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। পরে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার শেষে ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান দ্বিতীয় দফায় উদ্বোধন করেন। কিন্তু এত আয়োজনের পরও হাসপাতালটি আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উদ্বোধনের সময় কিছু জনবল নিয়োগ দেওয়া হলেও কয়েক মাসের মধ্যে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি হয়ে যান। বর্তমানে হাসপাতালের অনুমোদিত ১৭টি পদের মধ্যে ১৪টিই শূন্য। একই সঙ্গে এক্স-রে, ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রামসহ প্রয়োজনীয় ১৩ ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জামের একটিও নেই হাসপাতালে।
জগদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশিদ লাভলু বলেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণ করা হলেও এলাকার মানুষ এখান থেকে একটি প্যারাসিটামলও পায় না। সামান্য প্রসূতি রোগী কিংবা জরুরি চিকিৎসার জন্যও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সদরে যেতে হয়। পথে অনেক রোগী প্রাণ হারান। জনবল সংকটের অজুহাতে একটি হাসপাতাল বছরের পর বছর বন্ধ রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জগদল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ‘একটি এলাকার উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। অবকাঠামো রয়েছে, কিন্তু চিকিৎসক ও সেবা নেই। ফলে দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ চিকিৎসাবঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতালটি চালু হলে লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হতো।’
হাসপাতালের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আফজাল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় হাসপাতালের অবকাঠামো ও পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। হাসপাতাল সচল করতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং বিশেষ বরাদ্দ জরুরি।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দেবাশীষ রায় বলেন, হাসপাতালের ইনডোর ইউনিট চালু এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের জন্য একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তবে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ছাড়া ইনডোর সেবা চালু করা সম্ভব নয়।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, জগদল হাসপাতাল চালুর বিষয়ে কাজ চলছে। চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল পদায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় বাজেটও চাওয়া হয়েছে। আশা করছি দ্রুত হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হবে।