

প্রাণঘাতী বিরল জেনেটিক রোগ ‘সিস্টিক ফাইব্রোসিস’। এ রোগে আক্রান্ত হলে গড় আয়ু অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়। কঠোর বাস্তবতা হলো, শুধু ব্যয়বহুল চিকিৎসার কারণেই এ রোগে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে বাধ্য হয়। তবে, এ রোগাক্রান্ত মানুষের অসহায়ত্ব ঘোচাতে এগিয়ে এসেছে দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা। প্রচলিত আন্তর্জাতিক হিসাবে, একজন আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় যে ব্যয়, সে পরিমাণ অর্থ দিয়ে ৫৭ জনের চিকিৎসার সুযোগ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ১ লাখ ৮৯ হাজার মানুষ এ রোগে ভুগছেন। যাদের মাত্র ৬০ শতাংশ রোগীর রোগ নির্ণয় সম্ভব হয় এবং তাদের মধ্য থেকে চিকিৎসা পান মাত্র ২৭ শতাংশ।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভার্টেক্স ফার্মাসিউটিক্যালস উদ্ভাবিত ট্রিকাফটা এ রোগের চিকিৎসায় যুগান্তকারী ওষুধ। ওষুধটিতে ‘ইলেক্সাকাফটার’, ‘টেজাকাফটার’ ও ‘আইভাকাফটার’ তিনটি উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়, যা রোগীর আয়ু ও জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়। তবে এ ওষুধের দাম অত্যন্ত বেশি হওয়ায় বিশ্বের খুব কম সংখ্যক রোগীই এ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে পারে না।
এমন পরিস্থিতিতে, সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত শিশুদের মায়ের বেক্সিমকো ফার্মার উৎপাদিত ট্রিকাফটার জেনেরিক কপি ‘ট্রিকো’ রোগীদের হাতে পৌঁছে দিতে কমিউনিটি পরিচালিত বায়ারস ক্লাব চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ২৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে অনুষ্ঠিত নর্থ আমেরিকান সিস্টিক ফাইব্রোসিস কনফারেন্সে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
ঘোষণায় বলা হয়, বেক্সিমকো ফার্মার তৈরি ট্রিকোর মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় হবে বছরে শিশুপ্রতি মাত্র ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার, যেখানে মার্কিন কোম্পানির তৈরি ট্রিকাফটার ব্যয় বছরে ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, ট্রিকাফটার দামে একজন শিশুর চিকিৎসার সমান খরচে ট্রিকো দিয়ে ৫৮ জন শিশুর চিকিৎসা সম্ভব হবে। ওষুধটি ২০২৬ সালের এপ্রিল নাগাদ সরবরাহ করা হবে বলে জানানো হয়।
সম্মেলনে ‘রাইট টু ব্রিদ’ গ্লোবাল ক্যাম্পেইনের নেত্রী, যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘জাস্ট ট্রিটমেন্ট’-এর মুখ্য সমন্বয়ক এবং সিস্টিক ফাইব্রোসিসে আক্রান্ত এক শিশুর মা গেইল প্লেজার বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক দিন, যার জন্য সারা বিশ্বের সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগী ও তাদের পরিবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। আমরা দেখেছি, অনেক শিশু চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারিয়েছে, অথচ চিকিৎসার ব্যয় পুরোপুরি নাগালের বাইরে। সেই দুঃসহ অবস্থার পরিবর্তন হতে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক যে, ভুক্তভোগী রোগী ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সর্বত উদ্যোগের ফলে বিলিয়ন ডলার করেপোরেশনের সব অসহযোগিতা এবং বাধা অতিক্রম করে এরকম একটি দুরূহ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হয়েছে।’
বেক্সিমকো ফার্মার ট্রিকোর মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বছরে ১২ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার ও শিশুদের জন্য ৬ হাজার ৩৭৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ওষুধটির দামের তুলনায় বহু গুণ কম।
একই সঙ্গে কোম্পানিটি বেক্সডেকো নামে আরেকটি ওষুধ বাজারে আনছে, যা ট্রিকোর একটি উপাদান আইভাকাফটারের জেনেরিক সংস্করণ। এর দাম হবে প্রতি ট্যাবলেট মাত্র ৫ ডলার।
এ প্রসঙ্গে বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) রাব্বুর রেজা বলেন, ‘বেক্সিমকো ফার্মা সবসময় নিত্যনতুন ওষুধসহ ব্যয়বহুল চিকিৎসার রোগীদের জন্য সুলভ মূল্যে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু ওষুধ তৈরি নয়, বরং মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। সিস্টিক ফাইব্রোসিসের মতো বিরল রোগের চিকিৎসা খুবই সীমিত এবং তা এতটাই ব্যয়বহুল, যা বেশিরভাগ রোগীর সামর্থ্যের বাইরে। আমাদের তৈরি সাশ্রয়ী মূল্যের ট্রিকো সেই ব্যবধান ঘোচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
মালয়েশিয়াভিত্তিক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা থার্ড ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক, যুক্তরাজ্যের রোগীদের সংগঠন ‘জাস্ট ট্রিটমেন্ট’ এবং বিশ্বব্যাপী ‘রাইট টু ব্রিদ’ ক্যাম্পেইনের অনুরোধে অসহায় সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীদের সাহায্যার্থে, একান্ত মানবিক বিবেচনায় বেক্সিমকো ফার্মা এ ওষুধ তৈরির উদ্যোগ নেয়।
প্রসঙ্গত, সিস্টিক ফাইব্রোসিস (সিএফ) হলো একটি প্রগতিশীল জিনগত রোগ, যা শরীরে ঘন শ্লেষ্মা তৈরি করে, প্রাথমিকভাবে শ্বাসযন্ত্র ও পাচনতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। বিশেষত, সিস্টিক ফাইব্রোসিস ফুসফুস, অগ্ন্যাশয়, লিভার, গল ব্লাডার এবং অন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। প্রভাবিত অন্যান্য অঙ্গ সিস্টেম হলো জিনিটোরিনারি সিস্টেম এবং প্রজনন সিস্টেম। সুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে, নিঃসৃত তরল যেমন ঘাম, শ্লেষ্মা এবং পাচক রস পাতলা এবং মুক্ত প্রবাহিত হয়। সিস্টিক ফাইব্রোসিস রোগীদের মধ্যে তরল আঠালো ও ঘন হয়। ফলে এ অঙ্গগুলোর টিউব এবং নালিগুলো আটকে যায়।