

জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনের ৩০তম অধিবেশন কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ) ব্রাজিলের বেলেম শহরে গতকাল সোমবার শুরু হয়েছে। এবার সম্মেলনে বিশ্বনেতা, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও কর্মীরা দ্রুততর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ওপর নতুন করে জোর দিয়েছেন।
ব্রাজিলের সভাপতিত্বে আয়োজিত এবারের সম্মেলন ঘিরে নেওয়া হয়েছে ৩০ দফা কর্মপরিকল্পনা, যার প্রতিটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে আলাদা ‘অ্যাকটিভেশন গ্রুপ’। এ উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘মুতিরাঁও’—একটি আদিবাসী শব্দ, যার অর্থ ‘সমষ্টিগত প্রচেষ্টা’। নামটির মধ্য দিয়েই ব্রাজিল সরকার জলবায়ু লড়াইয়ে আদিবাসী নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
ব্রাজিল সরকার বলছে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাসহ সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যেন পূর্ববর্তী জলবায়ু প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়।
আমাজন রেইনফরেস্টের প্রান্তে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন বিশেষ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্বের বৃহত্তম উষ্ণমণ্ডলীয় অরণ্যটি বৈশ্বিক জলবায়ু স্থিতিশীলতায় মূল ভূমিকা পালন করে, অথচ কৃষি, খনন ও জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলনের কারণে এর অস্তিত্ব এখন ঝুঁকিতে। তাই এবারের কপ সম্মেলনকে বলা হচ্ছে ইমপ্লিমেন্টেশন কপ বা প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের সম্মেলন।
এবারের সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে বন সংরক্ষণে অর্থায়ন, জলবায়ু সহনশীলতা গঠন, অভিযোজন কৌশল এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন তহবিলের ব্যবস্থা।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের আওতায় এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে ১৫০টিরও বেশি দেশ। নীতিগতভাবে সব দেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে কাজ করতে বলা হলেও, উন্নত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ, তাদের নিঃসরণই বর্তমান উষ্ণতার বড় কারণ। এবারের সম্মেলনে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশ্ব এরই মধ্যে শিল্পপূর্ব যুগের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা সীমা অতিক্রম করেছে, যা ভবিষ্যতের গভীর জলবায়ু ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেছেন, উষ্ণমণ্ডলীয় বন ধ্বংস রোধে বৈশ্বিকভাবে সম্পদ ও প্রচেষ্টা সমন্বিত করতে হবে। তিনি নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, বরং পুরোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে জবাবদিহিমূলক কাঠামো গঠনের ওপর জোর দেন।
কপ৩০-এ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবার বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও বন রক্ষার দক্ষতাকে বৈশ্বিক জলবায়ু কৌশলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও তরুণ জলবায়ু কর্মীদের উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতির প্রতি বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও চাপের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
নতুন তহবিল গঠনের সম্ভাবনা: এবারের জলবায়ু সম্মেলনে নতুন তহবিল গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা উষ্ণমণ্ডলীয় বন সংরক্ষণ ও জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা বাড়াতে ব্যবহার হবে। ব্রাজিল আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে ডিজিটাল অবকাঠামো ও রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়।
এ জলবায়ু সম্মেলন চলবে আগামী ২১ নভেম্বর পর্যন্ত। আলোচনার শেষ পর্যায়ে বন্যা, খরা ও চরম তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অর্থায়ন কাঠামো অনুমোদনের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিকাশমান দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, প্রতিশ্রুত তহবিল না পাওয়ায় তারা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়ছে।
তিন দশকের জলবায়ু কূটনীতির ধারাবাহিকতায় কপ৩০ এখন এক মোড় ঘোরানো মুহূর্তে পৌঁছেছে—যেখানে প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।