রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:১৬ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

একটা গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে অর্থনীতির সুফল

অর্থনৈতিক সম্মেলনে বক্তারা
একটা গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে অর্থনীতির সুফল

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে একটি গোষ্ঠীর কাছে চলে গেছে। বর্তমান সময়ে যারা বিগত দিনে ব্যাংক লুট করেছে, তাদের না ধরে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে ১৪ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। এই মানুষগুলো যাবে কোথায়? তাই অর্থনৈতিক ন্যায্যতার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫-এ এসব কথা বলেন বক্তারা। দৈনিক বণিক বার্তা এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আমাদের ধারণা পাল্টাতে হবে। চোর ধরার চিন্তা থেকে বেরিয়ে বিশ্বাসের জায়গায় আসতে হবে। তাকে যদি বিশ্বাস না-ই করি, তাহলে ব্যবসা করে তারা দেশের জন্য কী করবে।

তিনি বলেন, গত ১৫ বছর যারা লুট করেছেন, চুরি করেছেন, ব্যাংক ডাকাতি করেছেন। লুটপাট করে নিয়ে চলে গেছেন। তাদের ধরেন, তাদের শাস্তি দেন। তাদের যে ইন্ডাস্ট্রিজগুলো, শিল্পকারখানা আছে, সেগুলোতে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে ১৪ লাখ বেকার হয়ে গেছে। এই লোকগুলো যাবে কোথায়? এই বেকারত্বটা আমরা সৃষ্টি করছি কেন? আমি মনে করি, বিষয়টা আমাদের আবারও ভেবে দেখা উচিত। এই কারখানাগুলো আমরা কীভাবে চালু করতে পারি, এই প্রতিষ্ঠানগুলোয় কীভাবে এই মানুষগুলোর কর্মসংস্থানে সৃষ্টি করতে পারি, সেটা আমাদের দেখা দরকার।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে না গিয়ে একটি গোষ্ঠীর কাছে চলে গেছে। তিনি বলেন, অর্থনীতি গণতন্ত্রের অংশ হতে হবে এবং এটি জনগণের কল্যাণে ব্যবহার হতে হবে। যতদিন অর্থনীতি শুধু একটি গোষ্ঠীর হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততদিন দেশের সাধারণ মানুষ এর সুফল ভোগ করতে পারবে না। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন করা ছাড়া দেশের আর্থিক পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আমীর খসরু বলেন, এজন্য আমাদের নতুন একটি অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যেন গ্রামীণ জনগণও উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে পারে, যেন তারা আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের পণ্য বিক্রি করতে পারে। বিপুল পরিমাণ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যেও যদি সেই উন্নয়ন শুধু একটি বিশেষ গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তাহলে জনগণের কাছে এর সুফল পৌঁছবে না।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এ দেশের অর্থনীতিতে গরিব-দুঃখী সবাই অবদান রেখে যাচ্ছে। আমাদের টোটাল ডেভেলপমেন্ট দুটি বড় খাত থেকে আসে—একটি বিভিন্ন পর্যায়ের ট্যাক্স, আরেকটি রেমিট্যান্স। ভিক্ষুক, শিল্পপতি এমনকি নবজাতক শিশুকেও ট্যাক্স দিতে হয়। যেহেতু সমাজের দায়িত্ব সবাই সমানভাবে নিচ্ছে, তাই অর্থনৈতিক বিষয়টিও ন্যায্যতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

অর্থনীতি পুনর্গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, এ অর্থনীতিতে যেমন বিভিন্ন সরকারি মারপ্যাঁচ, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য আছে, সেখানে অনেক দুর্বৃত্তপনাও আছে। ক্ষেত্রবিশেষে এ দুর্বৃত্তপনাকে রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। রাজনীতির বাইরে কোনো অর্থনীতি নেই মন্তব্য করে তিনি বলেন, সব নীতি সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ ও বিকশিত করবে রাজনীতি। ব্যবসায়ীরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। রাজনীতির জায়গা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত আমরা কাঙ্ক্ষিত কম্ফোর্ট জোন ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি করতে পারিনি।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত সরকার দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে মাফিয়া ও লুটেরা শ্রেণি ক্ষমতায় ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থেকেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সমাজের বৃহত্তর জনগণের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠায় জুলাইয়ের অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। যেখানে তরুণরা ন্যায্য অধিকার ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রত্যাশায় সংগ্রামে নেমেছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষিত হলে নতুন করে অভ্যুত্থানের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এটি গণতন্ত্রের একটি পথ। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধান বাধা হচ্ছে অস্বচ্ছ নির্বাচন অঙ্গন। এটি স্বচ্ছ করতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গন অস্বচ্ছ এবং এখানে ব্যাপক দুর্বৃত্তায়ন রয়েছে। এটিকেও স্বচ্ছ করতে হবে।

দেশের নির্বাচন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনকে ব্যবসায়ীকরণ করা হয়েছে, আর ব্যবসাকে রাজনীতিকরণ করা হয়েছে। সংস্কার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন প্রস্তাব করেছি। প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে এখানেও কাজ করতে হবে। তারা যে তথ্য দেন, সেগুলো যাচাই-বাছাই করতে হবে। টাকার খেলা ও মনোনয়ন বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। তবেই স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, একীভূত ব্যাংকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকবে। এর চেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক আর হবে না। সরকারের সাহায্যেই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিয়ে একটি সবল ব্যাংক তৈরি করব আমরা।

অচল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে কিছু করার দরকার ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ প্রয়োগ করে পাঁচ ব্যাংক নিয়ে আমরা একটি নতুন ব্যাংক করতে যাচ্ছি। আশা করি, আগামী সপ্তাহেই এ ব্যাংকের লঞ্চিং (যাত্রা) হয়ে যাবে। আসন্ন রমজানে বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের কোনো সংকট তৈরি হবে না বলেও জানান গভর্নর।

তিনি বলেন, গত বছর রমজান মাসে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই আমরা সর্বোচ্চ সরবরাহ নিশ্চিত করেছি। এ বছরও কোনো সংকট দেখছি না। বাজার নিয়ন্ত্রণে পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়ার সমালোচনা করে গভর্নর বলেন, এই যে ব্যুরোক্রেটিক ইন্টারভেনশন যেটা হয়, আমি মনে করি, এটা আমাদের জন্য কাউন্টার প্রডাক্টিভ। এতে কোনো লাভ হয় না। আমাদের চিন্তা করতে হবে বাজার কীভাবে মনিটরিং করা যায়, বাজারকে কীভাবে আমরা আরও বেশি সচল করতে পারি। সরবরাহ যেন সচল থাকে।

সম্মেলনে মুক্ত আলোচনায় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, ব্যাংকের চেয়ারম্যান, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, অর্থনীতিবিদসহ বিশিষ্টজন নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ, বিএসএমএর সভাপতি ও জিপিএইচ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হক, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন প্রমুখ।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মাইকে ঘোষণা দিয়ে ছাত্রদল নেতাদের ওপর ‘আ.লীগের’ হামলা, আহত ১৮

রাজনীতিতেই থাকতে চাই, চাকরি নয় : ছাত্রদল নেতার আবেগঘন স্ট্যাটাস

কালবেলায় সংবাদ প্রকাশ / জিম্মায় নেওয়া চুরির মালামাল থানায় ফেরত দিলেন কর্মকর্তা

প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সরকারদলীয় এমপিদের সভা অনুষ্ঠিত

সকাল ৯টার মধ্যে ১৮ জেলায় ঝড়ের আভাস

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই বাসের চালকসহ গ্রেপ্তার ৩ জনের জামিন

৩৫.৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড / সিলেটে তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নাহিদ ইসলামের বৈঠক

মধ্যরাতে দেশে পৌঁছাবে লেবাননে নিহত ২ বাংলাদেশির মরদেহ

শেষ মুহূর্তে বড় ধাক্কা, আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের বিশ্বকাপ শেষ

১০

বাসের ধাক্কায় প্রাণ গেল ৩ অটোরিকশা যাত্রীর

১১

রোগীকে আটকে ইনজেকশন পুশের টাকা দাবি, নার্সকে শোকজ  

১২

গৃহকর্মী থেকে মন্ত্রী : কলিতা মাঝির উত্থানের গল্প

১৩

নিউমার্কেট এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করল চসিক

১৪

এসএসসি পরীক্ষার্থীকে বলাৎকার, আ.লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২

১৫

তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর

১৬

ব্রাজিলের সামনে এবার মিসর

১৭

আগামী পাঁচ দিন কেমন থাকবে আবহাওয়া, জানাল অধিদপ্তর

১৮

ফ্ল্যাটে মিলল গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ, শরীরে আঘাতের চিহ্ন

১৯

সিলেটের কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে : সিসিক প্রশাসক

২০
X