

চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় একের পর এক আগুনে পুড়ছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘর। যেসব ঘটনা এই দুই উপজেলাজুড়ে চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক সৃষ্টি করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোর তদন্তের পাশাপাশি নিবিড় নজরদারির আওতা বাড়ায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। এরই ধারাবাহিকতায় পরিকল্পিত টানা অভিযানে অবশেষে রাউজান-রাঙ্গুনিয়ায় হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের বসতঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। বিশেষ অভিযানে অগ্নিসংযোগের এসব ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়েছে। পুলিশ বলছে, অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ছিল নাশকতামূলক, যা দেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে বিব্রত করার গভীর এক ষড়যন্ত্র। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে নিশ্চিত হয়, রাতের অন্ধকারে পরিকল্পিতভাবে ব্যানার টানিয়ে অগ্নিসংযোগ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলক। ঘটনার তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে গত ২ জানুয়ারি দুপুরে রাঙামাটির কলেজ গেট এলাকা থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আটক করা হয় বাকি ছয়জনকে।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আহসান হাবীব পলশ বলেন, “গত ডিসেম্বরে গভীর রাতে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানা এলাকায় একাধিক বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। এতে কয়েকটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কয়েকটি ঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের বস্তা দিয়ে তৈরি উসকানিমূলক ব্যানার উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যানারগুলোয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টে উসকানিমূলক বক্তব্য, রাজনৈতিক নেতাদের নাম ও অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর লেখা ছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র হিন্দু, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন’ ইস্যু তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলাই ছিল তাদের লক্ষ্য।”
উদ্ধার না হওয়া অবৈধ অস্ত্রের বিষয়ে ডিআইজি বলেন, ‘অস্ত্র উদ্ধার তো আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে। কিন্তু অস্ত্র এখনো যেগুলো আমরা পাইনি, সেগুলো এখনো আমাদের জন্য কেউ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বের করতে সাহস পাবে বলে আমার মনে হয় না। তারা যদি লুকিয়ে থাকে, বিভিন্ন সংগঠনের কথা আপনারা (গণমাধ্যমকর্মীরা) হয়তো না বললেও আমরা কিছু কিছু জানি, ছোটখাটো সংগঠন বা অনেকে আপনারা বলতে চান বিভিন্ন সময় তারা লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু তারা বের করার সাহস পাবে বলে আমরা মনে করি না, এই নির্বাচনের আগে। তবে আমাদের অপারেশন সবসময় চলছে। যখনই খবর পাচ্ছি, তখনই করছি। আপনারাও (সাংবাদিক) আমাদের সাহায্য করেন। অস্ত্র উদ্ধার যে কোনো সময় করা যায়। এটার জন্য বিশেষ অভিযান প্রয়োজন নেই।’
হিন্দু, বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে পুলিশের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান। তিনি বলেন, ‘এই অগ্নিসংযোগ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। যারা সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আগুন দিয়ে যারা সম্প্রীতি পোড়াতে চায়, তাদের আগুনেই পুড়িয়ে দেওয়ার মতো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। অপরাধী যেই হোক, যত প্রভাবশালীই হোক আইনের বাইরে কেউ নয়।’
অগ্নিসংযোগে জড়িত অভিযোগে গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে নাশকতার কাজে ব্যবহার করা বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানান রাউজান থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম পলাশ। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, কেরোসিন তেলের দুটি কনটেইনার, একটি কেরোসিন তেলের বোতল, তিনটি কেরোসিনে ভেজানো লুঙ্গি ও শার্ট এবং তিনটি খালি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তাররা হলো মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ। এরই মধ্যে মনির হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। আটকদের তথ্যের ভিত্তিতে অন্যান্য পলাতক সহযোগীকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ।’ অগ্নিসংযোগ, উসকানি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের যে কোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গ্রেপ্তারদের বিষয়ে জানাতে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ, চট্টগ্রামের এসপি মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খান, পুলিশ সুপার (অপরাধ) সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) রাসেল, রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের এএসপি বেলায়েত হোসেন, রাউজান থানার ওসি মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম পলাশ প্রমুখ।
জানা গেছে, রাউজান পৌরসভার সুলতানপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গত ২৩ ডিসেম্বর ভোরে বাইরে থেকে দরজা আটকে একটি বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বাড়িটি কাতারপ্রবাসী সুখ শীল নামে একজনের। সেখানে তার বোন ও বোন জামাই অনিল শীল থাকেন। আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়ির কাছ থেকে পুলিশ হাতে লেখা বিভিন্ন রাজনীতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিদের নাম এবং মোবাইল ফোন নম্বর লেখা ব্যানার জব্দ করে। এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর একইভাবে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঢেউয়াপাড়া এলাকায় বিমল তালুকদার ও রুবেল দাশ নামে দুজনের বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। আগুন লাগার বিষয়টি টের পেয়ে বাসিন্দারা ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে বাইরে থেকে দরজা আটকানো থাকার বিষয়টি বুঝতে পারেন। দুটি বসতঘরই দরজার বাইরে থেকে কাপড় দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। আর উঠানে কেরোসিন লাগানো কাপড় পড়ে ছিল বলে জানান স্থানীয়রা। তার আগে ১৯ ডিসেম্বর ভোরে কেউটিয়া ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সাধন বড়ুয়া এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আগুনে পোড়ে সোনা পাল ও কামিনী মোহন পালের বসতঘর। ওইদিনও বাড়ি দুটির উঠান থেকে কেরোসিন মিশ্রিত কাপড়, বিভিন্ন রাজনীতিক ও সরকারের ঊর্ধ্বতনদের নাম এবং মোবাইল ফোন নম্বর লেখা কাগজ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ২৬ ডিসেম্বর রাতে রাউজানের গহিরা বাজারে একটি কাপড়ের ভ্যানে আগুন দেওয়ার সময় কেরোসিনের বোতলসহ মো. মোরশেদুল আলম (৫৫) নামে একজনকে হাতেনাতে ধরা হয়।