

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) ২০২৬-২৮ বর্ষের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল গত ২৭ জুন। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই নানা ঘটনায় আটকে যায় নির্বাচন।
এ নির্বাচনে অংশ নিতে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কথা জানালেও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বে থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের (ডিটিও) নিয়োগকৃত সচিবরা বলছেন, জমা হওয়া কোনো মনোনয়নপত্র হাতে পাননি তারা। এতে সেই মনোনয়নপত্রগুলো কোথায় গেল এবং বেসিস নির্বাচনের কলকাঠি আসলে কার হাতে, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বেসিসের সদস্যদের অনেকে বলছেন, ডিটিও সময়মতো নির্বাচন করতে না পারলে সমঝোতা করে হলেও একটা পরিচালনা পর্ষদ ঠিক করে বেসিসের দায়িত্ব হস্তান্তর করে দিক। এতে করে অন্তত সফটওয়্যার খাত তাদের অভিভাবক ফেরত পাবে।
চলতি বছরের ৫ এপ্রিল বেসিস নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের উপসচিব ও বেসিস নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান তানিয়া ইসলাম স্বাক্ষরিত তপশিল অনুযায়ী, গত ২১ মে ছিল মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন।
অভিযোগ উঠেছে, সেদিন যাতে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে না পারে, সেজন্য রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনের পঞ্চমতলায় বেসিস কার্যালয় এবং নিচে ভবনের সামনে প্রচুর বহিরাগত লোকজনকে জড়ো করা হয়। এসবের মধ্যেও মনোনয়নপত্র জমা দেন কয়েকজন প্রার্থী। আবার এমন পরিস্থিতি দেখে মনোনয়নপত্র জমা না দিয়ে ফেরতও যান কয়েকজন।
জানা গেছে, ২১ মে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনের পর নির্বাচনসংক্রান্ত আর কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করেনি নির্বাচন কমিশন। অভিযোগ রয়েছে, ২১ মে যেসব মনোনয়ন জমা হয়েছে, সেই মনোনয়নের কাগজ বুঝে পাননি নির্বাচন বোর্ডের সদস্যরা। আর বেসিস প্রশাসক সে সময় হজ পালনে সৌদি আরবে থাকায় বেসিস দপ্তর থেকে মনোনয়নের কাগজ কোথায় গেছে, তা তার জানা নেই বলে জানিয়েছেন।
নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাওয়া কয়েকজন ২১ মে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়টি কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন। তবে তাদের প্রার্থিতা বৈধ হয়েছে নাকি বাতিল হয়েছে, সে বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। কারণ নির্বাচন বোর্ড থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কিছু জানানো হয়নি।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া বেসিস সদস্য যাচাই ডট কমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েট ক্যাটাগরির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আজিজ কালবেলাকে বলেন, ‘আমি যে পরিস্থিতি দেখেছি, তাতে আমি ভেতরে যাইনি। গেলে হয়তো আমি জমা দিতে পারতাম না। তাই নিজে না গিয়ে আমি আমার প্রতিনিধির মাধ্যমে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি।’ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর নির্বাচন বোর্ড থেকে কোনো বার্তা পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন বোর্ডের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাইনি। ডেডলাইন চলে গেল, আমার মনোনয়নপত্র গৃহীত হলো নাকি বাতিল হলো—কোনো তথ্যই আমাদের কাছে নেই। আদৌ নির্বাচন হবে কি না, এ বিষয়টি জানারও সুযোগ নেই।’
সংগঠনটির সাবেক কয়েকজন সভাপতির সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, যেহেতু নির্বাচিত প্রতিনিধি এখন দায়িত্বে নেই, তাই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে নির্বাচনসংক্রান্ত সমস্যা সমাধান করে দ্রুত নির্বাচন দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।
সূত্র বলছে, ২১ মে বেসিস কার্যালয়ে সংঘটিত ঘটনা নিয়ে দায়িত্বরত কেউ মুখ না খুললেও বেসিস নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ২৩ মে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি অনুবিভাগের নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান তানিয়া ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২১ মের ঘটনার বিবরণ জমা দেওয়া হয়, যেখানে মনোনয়নপত্র বেহাত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এরপর গত ২১ জুন শুনানি করে দুটি সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বেসিস প্রশাসক বরাবর মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে বেসিস প্রশাসককে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বেসিসের ২০২৬-২৮ দ্বিবার্ষিক নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করার লক্ষ্যে অবিলম্বে পুনঃতপশিল ঘোষণা করতে বলা হয়।
২১ মে বেসিসে কী হয়েছিল এবং জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র কোথায় গেল, তা নির্বাচন বোর্ডের তিন সদস্যের কাছে জানতে চেয়েছে কালবেলা। জবাবে নির্বাচন বোর্ডের সদস্য উপসচিব মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাবেন। একই উত্তর দিয়েছেন প্রশিক্ষণে থাকা আরেক সদস্য নাসরিন সুলতানা।
একই প্রশ্নের জবাবে বেসিস নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান তানিয়া ইসলাম কালবেলাকে বলেন, নির্বাচন বোর্ডে আমরা তিনজন সদস্য, সবাই একসঙ্গে বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাব। আমাদের একজন ট্রেনিংয়ে আছেন, উনি ফিরলেই আমরা বসব।
২১ মে জমা হওয়া মনোনয়নপত্রগুলো হাতে পেয়েছেন কি না ফের এমন প্রশ্ন করলে এ কর্মকর্তা বলেন, ‘৩ জুনের শুনানি অনুযায়ী ২১ জুন বেসিস নির্বাচন নিয়ে যে সিদ্ধান্তের চিঠি এসেছে, সেখানে ২১ মে নিয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তাই এখনই আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। আমরা তিনজন একসঙ্গে বসেই সিদ্ধান্ত নেব।’
এদিকে, বেসিস নির্বাচন ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের গাফিলতি ও অদক্ষতা হিসেবে দেখছেন বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এ কে এম ফাহিম মাসরুর। কালবেলাকে তিনি বলেন, নিশ্চয়ই এ মন্ত্রণালয়ের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য ছিল, না হলে বেসিসের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সংগঠনের অস্তিত্ব কেন হুমকির মুখে পড়বে? এই দায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়—দুই মন্ত্রণালয়েরই নেওয়া উচিত। কারণ বেসিসে কোনোদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। আমি আশঙ্কা করছি, এখানে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এ নির্বাচন করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটা নির্বাচন বোর্ড করেছে। তার মানে নির্বাচনটা এখন সরকার পরিচালনা করছে। সরকারের লোকজনের সামনে থেকে এমন অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটল, সরকার কি কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে? পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেছে? এটা আসলে খুবই দুঃখজনক ঘটনা।
জমা হওয়া মনোনয়নপত্রগুলো কোথায় গেল–এমন প্রশ্নের জবাবে বেসিস প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব আবুল খায়ের মোহাম্মদ হাফিজুল্লাহ খান বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন আমি হজে ছিলাম, তাই সরাসরি কিছু জানি না। নির্বাচন বোর্ডের কাছে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তারা জানিয়েছে তাদের হাতেও মনোনয়নপত্র নেই। ২১ মে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত ঘটনা বেসিসে ঘটেছিল। কারা করেছিল সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটা তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে গত ২১ জুন একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ২৭ জুন আমি বেসিসে একটা সভা করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি।’
মনোনয়নপত্র কার হেফাজতে আছে এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু ছিলাম না, আমি টেলিফোনে কথা বলেছি। উনারা আমাকে জানিয়েছে একটা ঝামেলা হয়েছে, পরে পুলিশ এসেছিল। পরবর্তী সময়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন, এখানে কয়েকটা পক্ষ এসে ঝামেলা করছে, আমি তাদের সরিয়ে দিয়েছি। তবে মনোনয়নপত্র কার হেফাজতে এ প্রশ্নের সদুত্তর তিনি দিতে পারেননি। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।’