

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সব উত্তেজনা যেন জড়ো হয়েছে মেক্সিকো-ইংল্যান্ড ম্যাচ ঘিরে। সেই উত্তেজনা মাঠ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে মেক্সিকো সিটির হোটেল-রেস্টুরেন্ট বার-পাবগুলোত, বাদ নেই শহরের বড় রাস্তা, অলিগলি আর ফ্যান ফেস্টের বিশাল সব আয়োজনে, ম্যাচ ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা পরিকল্পনায় মহাব্যস্ত দেশটির সরকার। আর এসব কিছুই এখন বিশ্বগণমাধ্যমের শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে। বিশ্বকাপের সহ- আয়োজক মেক্সিকো, সেখানকার আজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক সুবিধা নিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। আর সেই ম্যাচটিকেই ফুটবলবোদ্ধারা বলছেন এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচগুলোর একটি হতে চলছে রোববার রাতে। যেখানে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ শুধু মেক্সিকোর এগারো ফুটবলার নয়, প্রতিপক্ষ হবে ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতার সঙ্গে গ্যালারিতে ৮৩ হাজার দর্শকের গর্জন, সেইসঙ্গে এক ফুটবলপাগল শহরের আবেগি রূপ তো থাকছেই।
প্রতিপক্ষ নিশ্চিত হতেই ম্যাচটি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে নানা ঘটনা… এই যেমন বিবিসির জানাচ্ছে প্রস্তুতি নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন রাখতে ইংল্যান্ড হোটেল লোকেশন গোপন রাখছে, স্লিপ ডিভাইস, ইয়ারপ্লাগ, স্লিপ ব্যান্ড ও হোয়াইট-নয়েজ মেশিনের ব্যবহারে এরই মধ্যে শুরু করেছে। ইংলিশদের কেন এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। জানা গেল, মেক্সিকোর সবশেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর অভিযোগ করেছিল, তাদের দলকে ম্যাচের আগের রাতে হোটেলের বাইরে শব্দ করে ঘুমাতে দেওয়া হয়নি। ইংলিশ দৈনিক গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইকুয়েডরের অভিযোগের পর ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন মেক্সিকো সিটিতে দলীয় হোটেলের নিরাপত্তা নতুন করে পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। মেক্সিকান সমর্থকরা হর্ন, লাউডস্পিকার ও মোটরসাইকেলের শব্দে আগের দিনের মতো রাতভর পরিবেশ যেন উত্তপ্ত না করে তাতে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা এরই মাঝে নিশ্চিত করেছেন আয়োজকরা। যদিও ফুটবলে এমন মানসিক চাপ প্রচলিত। তবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচ বলে কথা। যেখানে প্রত্যেক ঘণ্টার ঘুম, প্রতিটি মুহূর্তের কর্মকাণ্ড, প্রতিটি সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখন হোটেলের জানালার বাইরের শব্দও ম্যাচের অংশ হয়ে যায়। সেদিকটা নজর এড়ায়নি ইংল্যান্ড টিম ম্যানেজমেন্টের। তাই এবার শুধু কৌশলগত নয়, ঘুমের প্রস্তুতিতেও সতর্ক থমাস টুখেল বাহিনী। সমুদ্রপিষ্ঠ থেকে ২ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় মেক্সিকো সিটির অবস্থান। ইংল্যান্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের একটি তা। এমন উচ্চতায় বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকা। তাতে খেলোয়াড়দের টানা দৌড়ানো, দ্রুত রিকভারি এবং ৯০ মিনিটের তীব্রতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ড কোচ থমাস টুখেল বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। বলেছেন, এত অল্প সময়ে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শারীরিকভাবে সম্ভব নয়। অন্যদিকে মেক্সিকো নিজেদের চার ম্যাচের তিনটিই খেলেছে আজতেকায়, আর আরেকটি খেলেছে এমনই একটি শহর গুয়াদালাহারায়। অর্থাৎ বলাই যায়, স্বাগতিকরা শুধু মাঠ নয়, এখনকার বাতাসের সঙ্গেও সুপরিচিত।
ইংল্যান্ড-মেক্সিকো আজকের ম্যাচ দিয়ে আজতেকা স্টেডিয়ামটি ইতিহাসের মঞ্চ নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে। ফিফা ভাষায়, স্টেডিয়ামটি বিশ্ব ফুটবলের এক পৌরাণিক মন্দির; ১৯৭০ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের ভেন্যু, পেলে ও ম্যারাডোনার স্মৃতিধন্য মাঠ। ২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম আবার ইতিহাস গড়েছে। তিন-তিনটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করে নিয়ে এক অনন্য অর্জন আজতেকা স্টেডিয়ামে রোববার ইংল্যান্ডের সামনে শুধু মেক্সিকো নয়, ইতিহাসও দাঁড়িয়ে থাকবে।
মেক্সিকো-ইংল্যান্ড ম্যাচের একদিন আগেই শহরের আবহ যেন ফুটবল উৎসবের রঙে রাঙানো জাঁকালো ফ্যান ফেস্ট, রাস্তার পতাকা, সবুজ জার্সিতে ভরা মেট্রো, বার-রেস্তোরাঁর বাইরে ভিড়—সব মিলিয়ে রাজধানী যেন পুরোটাই দর্শকে ঠাসা এক গ্যালারি। মেক্সিকান সংবাদমাধ্যমের খবর বিশ্বকাপের উদ্বোধনী উৎসবেই আজতেকা, ফ্যান ফেস্ট ও শহরের বিভিন্ন ফুটবল আয়োজনে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিল। সেই উৎসবের ধারাই এখন ইংল্যান্ড ম্যাচের আগে আরও উন্মাদনায় রূপ নিয়েছে। ওদিকে ইংল্যান্ডের জন্য এটি বাঁচামরার ম্যাচ; মেক্সিকোর জন্য স্বপ্নকে আরও দূরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ। সে কারণে আজতেকার রাত তাই শুধু ফুটবল ম্যাচ নয়, এক শহরের আবেগ বনাম এক দলের শৃঙ্খলা, নরম বাতাস বনাম প্রস্তুতি, আর গ্যালারির গর্জন বনাম ইংল্যান্ডের স্নায়ুর লড়াই। আর সেই লড়াই শুরু হয়ে গেছে মাঠে বাঁশি বাজার আগেই। আয়োজকরাও এই মহাযজ্ঞ সফল করতে কোনো ত্রুটি রাখছেন না। আজতেকা স্টেডিয়ামে সংস্কার কাজ চালানো হয়েছে প্রায় ১১০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে—নতুন এলইডি লাইটিং, বড় পর্দা, নতুন ড্রেসিংরুম আর মাঠের অবকাঠামো ঢেলে সাজানো হয়েছে। নিরাপত্তার দিক থেকেও এবারের আয়োজন মেক্সিকোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে, কারণ লাখো দর্শকের ঢল সামলাতে ব্যাপক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে পুরো শহরজুড়ে। সব মিলিয়ে, ফুটবল ইতিহাসের পাতায় আরেকটি অবিস্মরণীয় লড়াইয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পুরো বিশ্ব। একদিকে মেক্সিকোর অগ্নিকুণ্ডের মতো জ্বলন্ত আবেগ, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের শীতল স্নায়ু—এই দুইয়ের লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবে, তা জানার জন্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শক টেলিভিশন স্ক্রিনের সামনে বসে থাকবেন। মেক্সিকো সিটির বাতাস এখন ফুটবলের শুদ্ধতম উন্মাদনায় ভারী। রেফারির বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হবে এক নতুন ইতিহাস লেখার পালা, যা আগামী কয়েক দশক ধরে ফুটবলপ্রেমীদের মুখে মুখে ফিরবে।