

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার সোনারা গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান আল আমিন নয়ন। পড়তেন গাইবান্ধা সরকারি কলেজে সম্মান শ্রেণিতে। দ্বিতীয় বর্ষে থাকতে একই এলাকার ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী পরিবারের মেয়ে রুনি আক্তারের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। বছরখানেক চলে তাদের মন দেওয়া-নেওয়া। শেষ পর্যন্ত সামাজিক আর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রেমিক নয়ন নিজের জীবন বিলিয়ে অসম প্রেমের প্রতিদান দেন। রেললাইনে মেলে তার লাশ।
২০১৪ সালের এই প্রেমের গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। এর পরের ঘটনা আরও চাঞ্চল্যকর, যা সিনেমার রহস্যময় গল্পের কাহিনিকেও হার মানায়। রেললাইনে নয়নের মরদেহ পাওয়ার পর ‘ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর’ তথ্য ছড়ায়। রেলওয়ে থানায় নিয়ম মতো অপমৃত্যুর মামলা হয়। রেল পুলিশের তদন্তেও ‘তাই প্রমাণিত’ হয়। অবশ্য নয়নের ছোট্ট মুদি দোকানি দরিদ্র বাবা রফিকুল ইসলামের মন তাতে সায় দেয় না। রংপুরের আদালতে তিনি নালিশি মামলা করেন। তাতে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। সেই তদন্তেও বের হয় নয়ন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন, আদালতেও সে মতে দেওয়া হয় ফাইনাল রিপোর্ট। আড়ালেই থাকে অসম প্রেমের বলিদানের তথ্য।
তবে গ্রামের অশিক্ষিত বাবা রফিকুল ছেলের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারেন না। তিনি ফের আদালতে পুনঃতন্তের আবেদন করেন। এবার মামলা তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এবার বেরিয়ে আসে রোমহর্ষক কাহিনি—নয়ন-রুনির প্রেমের ঘটনা জেনে গিয়েছিল রুনির পরিবার। তাতে ক্ষিপ্ত হয় প্রভাবশালী পরিবারটি। নয়নকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে তারা। এক রাতে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার ফাঁদ পেতে ডেকে আনা হয় নয়নকে। এরপর পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যার পর মরদেহ ফেলা হয় রেললাইনের ওপর। প্রেমিক নয়নের লাশের ওপর দিয়ে চলে যায় ট্রেন। একই এলাকার রুনির পরিবারের সদস্যরা তথ্য ছড়িয়ে দেন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন নয়ন, এ নিয়ে তারা মায়াকান্নাও করেন।
পিবিআইর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পুরো ঘটনা জানতেন প্রেমিকা রুনি। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ম্যানেজ করেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এরপর রুনিকে বিয়ে দেওয়া হয় ইতালি প্রবাসীর কাছে, পিবিআইর চার্জশিটে আসামি হলেও সেখানেই সুখে-শান্তিতে বসবাস করছেন প্রেমিকা রুনি। পিবিআই ওই মামলায় চার্জশিট দিলেও ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন নয়নের বাবা রফিকুল ইসলাম।
পিবিআইর তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল পীরগাছা রেলস্টেশন থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে সুকানপুকুর রেলওয়ে ব্রিজ এলাকা থেকে নয়নের মরদেহ উদ্ধার করে বোনারপাড়া রেলওয়ে পুলিশ। শুরুতে দাফন হলেও পরে পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ কবর থেকে তুলে ফের ময়নাতদন্ত করা হয়।
যেভাবে হত্যার পর গল্প সাজানো হয় ট্রেনে কাটার: পিবিআইর তদন্ত ও চার্জশিটে উঠে এসেছে, নয়নের পাশের গ্রাম তাম্বুলপুর ফকিরপাড়ার জলিল ফকিরের মেয়ে রুনি। এলাকার ধনাঢ্য, বংশীয় ও প্রভাবশালী ফকির পরিবার এই প্রেমের সম্পর্ক মেনে নেয়নি। এতে নয়ন ও রুনির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়, বন্ধ হয়ে যায় দেখাও। তবে তলে তলে নয়নকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় রুনির পরিবার। পরিকল্পনা অনুযায়ী রুনির ভাই জুয়েল তার বন্ধু তুষারকে দিয়ে কৌশলে নয়নকে খবর পাঠায়, রাতে (৭ এপ্রিল, ২০১৪) রুনি গোপনে নয়নের সঙ্গে দেখা করবে। প্রিয় মানুষকে দেখার বাসনায় সেই রাতে নয়ন ছুটে যায় রুনির বাড়ির পাশে। ওতপেতে থাকা রুনির ভাই জুয়েল এবং অন্যান্য চাচাতো ভাইসহ পরিবারের সদস্যরা তাকে তখন আটক করে। প্রথমে বাড়ির পাশের একটি ব্রিজের কাছে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে পাশের একটি জমিতে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার দুই হাতে ও বুকে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করা হয়।
পিবিআইর তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হত্যার পর ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মরদেহ একটি বস্তায় ভরে রিকশাভ্যানে করে সুকানপুকুর রেললাইনের পাশে নেওয়া হয়। নয়নের রক্তাক্ত দেহটি রেললাইনের ওপর শুইয়ে দেওয়া হয়। ট্রেন এসে মরদেহের ওপর দিয়ে চলে না যাওয়া পর্যন্ত রুনির ভাইসহ অন্য স্বজনরা ঘটনাস্থলের আশপাশেই অপেক্ষা করতে থাকেন। সবকিছু ‘ঠিকঠাক’ হওয়ার পর ঘটনাস্থল ছেড়ে তারা নয়নের বাড়িতে খবর পাঠান, ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন নয়ন।
যেভাবে রহস্য উদ্ঘাটন করল পিবিআই: পিবিআিইর তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত শুরু করেই কয়েকটি অসংগতি চোখে পড়ে তদন্ত দলের। নয়নের মরদেহের ছবি বিশ্লেষণ করে তদন্ত দল দেখতে পায়, বুকের বাঁ পাশে গভীর ধারালো অস্ত্রের ক্ষত। তবে সেটি রেল পুলিশের করা সুরতহাল কিংবা পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে নেই! ছবি বিশ্লেষণে বের হয়, হাতের তালুতেও একাধিক কাটা দাগ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সন্দেহভাজন আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে নয়নের মরদেহের ছবির দৃশ্য মিলে যায়। আবার খুনে অংশ নেওয়া কয়েকজন সুরতহাল প্রতিবেদনে সাক্ষী হন! কিন্তু ডিজিটাল তদন্তে তাদের কয়েকজনের অবস্থান ঘটনার সময় রেললাইনে নয়নের লাশের পাশে শনাক্ত হয়। তাতে সন্দেহ আরও জোরালো হয়।
ওই কর্মকর্তা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে রুনির ভাই জুয়েল হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় বন্ধু তুষারকে।
মামলাটি তদন্ত করেছিলেন পিবিআই রংপুর অফিসের তৎকালীন পরিদর্শক হোসেন আলী। তিনি বর্তমানে দিনাজপুর জেলা সিআইডির পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, মরদেহের ছবি দেখেই আমার মনে হয়েছিল এটি রেল দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। ট্রেনে কাটা পড়লে শরীর ছিন্নভিন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে বুকে গভীর ধারালো অস্ত্রের আঘাত এবং বাঁ হাতে কোপের দাগ ছিল। পরে জিজ্ঞাসাবাদে রুনির ভাই জুয়েল হত্যার কথা স্বীকার করলে পুরো ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘ঘটনার প্রায় দুই বছর পর যখন মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পাই, তখন আসামিদের মধ্যে একজন মারা গেছেন, প্রেমিকা রুনি ও তার এক চাচা বিদেশে ছিলেন। অপর এক আসামি পলাতক ছিল। শুধু জুয়েল এবং তুষারকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি ছয়জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এখনও মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলছে।