

বড় কোনো সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হলে, যেমন—কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই করা, ক্যারিয়ার বদল, বিয়ে বা বিচ্ছেদ—সাধারণত মানুষ অনেক ভাবনা ভাবতে শুরু করে। এটা একদম স্বাভাবিক। কারণ, জীবন বদলে দেয় এমন সিদ্ধান্তগুলো সাধারণত গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়; কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায় যে, মানুষ একেবারে ছোটখাটো বিষয় নিয়েও বারবার মাথা ঘুরিয়ে ফেলে। এমনকি ছোট সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও ‘কী হলে কী হতো’ ভাবতে ভাবতে তারা একদম স্থবির হয়ে যায়। একে বলা হয় ওভারথিংকিং (overthinking) বা অতিরিক্ত চিন্তা।
কখনো কখনো মাথার ভেতরে অল্প সময়ের জন্য চিন্তা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি এটি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কাজ, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য—সবকিছুতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ছোট ছোট সিদ্ধান্তও বড় হয়ে দেখা যায় এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।
কীভাবে বুঝতে পারবেন আপনি বেশি চিন্তা করছেন
যদি মনে হয় যে কোনো পরিস্থিতি বা সমস্যা নিয়ে আপনি অতিরিক্তভাবে চিন্তা করছেন, তাহলে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো থেকে তা বোঝা যায়। অধিক চিন্তার সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
n মনে কোনো অন্য কথাই আসছে না, সবসময় একই বিষয় ঘুরেফিরে মনে আসে।
n আরাম করতে পারছেন না, মাথা শান্ত না হওয়া, সবসময় টেনশনে থাকা।
n চিরকালই উদ্বিগ্ন বা চিন্তিত থাকা ক্ষুদ্র বিষয় নিয়েও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা হওয়া।
n যেসব জিনিস আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেগুলো নিয়ে ঘেঁটে থাকা এমন কিছু নিয়ে বারবার চিন্তা করা, যেটা বদলানো সম্ভব নয়।
n মানসিকভাবে ক্লান্ত লাগা, একের পর এক চিন্তা মাথা ঘুরিয়ে ফেলে, মানসিকভাবে নিরাশ লাগে।
n অনেক নেতিবাচক চিন্তা, সবকিছুতেই খারাপ দিক খুঁজে বের করা।
n একই ঘটনা বারবার মনের মধ্যে বাজানো, অতীতের কোনো মুহূর্ত বারবার মনে আসে এবং সেই মুহূর্তটা পুনরায় খেলানো।
n নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ করা, যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই সঠিক কি না—সেটা নিয়ে বারবার ভাবা।
n সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি চিন্তা করা সবসময় ‘সবচেয়ে খারাপটা’ কী হতে পারে—এ ভাবনায় আটকে থাকা।
মানুষ কেন অতিরিক্ত চিন্তা করে?
অতিরিক্ত চিন্তার কারণ অনেকরকম হতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তারা জানে যে তারা অতিরিক্ত চিন্তা করছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এটা অজান্তেই ঘটে—তারা নিজেরাই বুঝতে পারে না যে, তাদের চিন্তা ‘অতিরিক্ত’ হয়ে গেছে। প্রত্যেক মানুষের কারণ আলাদা হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ কারণ দেখা যায়। চলুন দেখে নিই কারণগুলো—
উদ্বেগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা
অনেকে অতিরিক্ত চিন্তা করেন কারণ তারা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চান এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হতে চান। নিউইয়র্ক সিটির নিউরোসাইকোলজিস্ট ড. সানাম হাফিজ (PsyD) বলেন, যখন আপনি অতিরিক্ত চিন্তা করছেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক সম্ভাব্য সব পরিস্থিতি ভাবতে থাকে এবং কী হবে সেটা আগে থেকে অনুমান করার চেষ্টা করে—যাতে আপনার উদ্বেগ কমে। কিন্তু সমস্যা হলো, এ চিন্তার চক্রে আটকে গিয়ে অনেক সময় মানুষ আগানোর বা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ড. হাফিজ আরও বলেন, ‘অতিরিক্ত চিন্তার সমস্যা হলো আমাদের মন প্রায় সবসময় আরেকটা উদ্বেগ-সম্পর্কিত প্রশ্ন নিয়ে আসে।’
পারফেকশনিজম (পরিপূর্ণতা খোঁজা)
গবেষকরা মনে করেন, পারফেকশনিস্টরা অন্যদের তুলনায় বেশি ‘রিউমিনেট’ বা অতিরিক্তভাবে ঘোরাফেরা করে। পারফেকশনিস্টরা সাধারণত নিজেদের এবং অন্যদের জন্য অত্যন্ত উচ্চমান নির্ধারণ করেন। ড. হাফিজ বলেন, “পারফেকশনিস্ট এবং ওভারঅচিভারদের অতিরিক্ত চিন্তা করার প্রবণতা থাকে। কারণ, ব্যর্থ হওয়ার ভয় এবং ‘সম্পূর্ণ’ হতে হবে—এ চাপ তাদের দখল করে নেয়। ফলে তারা সিদ্ধান্ত ও ভুলগুলো বারবার মনের মধ্যে খেলায়।”
শেম (লজ্জা)
লজ্জা হলো অতীতের কোনো কাজের কারণে নিজের সম্পর্কে খারাপ অনুভব করা। অনেক মানুষ অতীতের ভুলগুলো নিয়ে বারবার চিন্তা করেন, যা তারা করলে অনুশোচনা করেন এবং যদি পারতেন বদলাতে চাইতেন। উদাহরণ হিসেবে কেউ হয়তো শেষ হওয়া একটি সম্পর্ক বা ব্যর্থ একটি উদ্যোগ নিয়ে বারবার চিন্তা করতে পারে। কিছুটা পরিমাণে অতীতের ভুলগুলো নিয়ে ভাবা ভবিষ্যতে শেখার জন্য সাহায্য করতে পারে, কিন্তু একাধিকবার সেই ভুলগুলো নিয়ে ঘুরেফিরে ভাবা আপনার সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতি এবং বিষণ্নতা সৃষ্টি করতে পারে।
ইনডেসিসিভনেস (সিদ্ধান্তহীনতা বা দ্বিধাগ্রস্ততা)
কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সুফল-অসুবিধা ভাবা অনেক সময় উপকারী; কিন্তু যদি আপনি একই বিষয় বারবার ঘেঁটে যান এবং সিদ্ধান্তের কাছাকাছি আসতে না পারেন, তখন এটি অতিরিক্ত চিন্তায় পরিণত হয়। এটি বিশেষ করে বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বেশি ঘটে—যেমন কোথায় বাড়ি কিনবেন, নতুন চাকরি নেবেন কি না ইত্যাদি।
অতিরিক্ত চিন্তা কি কোনো মানসিক অসুস্থতা?
অতিরিক্ত চিন্তা নিজে কোনো স্বীকৃত মানসিক রোগ নয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি প্রায়ই অন্য মানসিক সমস্যার লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, উদ্বেগ (Anxiety) এবং ডিপ্রেশন অতিরিক্ত চিন্তার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া যারা কোনো ট্রমার (Trauma) শিকার, তারা অনেক সময় সবসময় সতর্ক বা বিপদসংকেত খুঁজতে থাকে—যার ফলে তারা অতিরিক্তভাবে চিন্তা করতে পারে।
অতিরিক্ত চিন্তার সঙ্গে যুক্ত কিছু মানসিক অবস্থা
ডিপ্রেশন: উদ্বেগজনিত রোগ (যেমন জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি, প্যানিক ডিসঅর্ডার)
অবসেসিভ-কোম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD)
পোস্ট-ট্রমেটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)
বাড়তি স্ট্রেস: মনোযোগ কমে যাওয়া, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা, অতিরিক্ত অপরাধবোধ, ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধা কমে বা বেড়ে যাওয়া, বদহজম, বমিভাব বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি
ওভারজেনারালাইজিং (Overgeneralizing)
এক বা দুবার কোনো ঘটনা ঘটায়, তা সবসময়ই ঘটবে ধরে নেওয়া।
জাম্পিং টু কনক্লুশন (Jumping to conclusions) যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া।
মাইন্ড রিডিং (Mind reading) অন্য কেউ কী ভাবছে, তা নিজের অনুমান ধরে নেওয়া।
সব কিছু নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বন্ধ করতে কী করবেন?
এটা এক দিনেই বন্ধ হবে না, কিন্তু আপনি চিন্তার চক্র ভাঙতে পারবেন। নিচের পরামর্শগুলো আপনাকে শুরু করতে সাহায্য করবে—
ট্রিগার ও প্যাটার্ন খুঁজে বের করুন: একটা জার্নাল রাখুন এবং লিখে রাখুন কখন আপনার অতিরিক্ত চিন্তা শুরু হয়। কিছুদিন পর আপনি প্যাটার্ন দেখতে পাবেন। এতে আপনি বুঝতে পারবেন কোন পরিস্থিতিতে আপনি বেশি চিন্তা করেন এবং সেই পরিস্থিতির জন্য coping strategy তৈরি করতে পারবেন।
আপনার চিন্তা চ্যালেঞ্জ করুন: আপনার মন যা বলছে, সব বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। রিউমিনেশনকে চ্যালেঞ্জ করার ভালো উপায় হলো—একধাপ পেছনে সরে গিয়ে বিষয়টি অবজেকটিভভাবে দেখা। ড. হাফিজ বলেন, ‘পরিস্থিতির প্রমাণ দেখুন—এ চিন্তাটা যুক্তিযুক্ত, বাস্তবসম্মত বা উপকারী কি না।’ যদি আপনি দেখেন চিন্তাগুলো যৌক্তিক নয় বা কাজে আসে না, তাহলে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
বন্ধুদের সাহায্য নিন: বন্ধুদের কাছ থেকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমর্থন পাওয়া অনেক সময় সাহায্য করে। এমন একজন বন্ধুকে বেছে নিন যিনি এরই মধ্যেই অতিরিক্ত চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তাদের কাছে বলতে পারেন—‘যখন আমি অতিরিক্ত চিন্তা করতে শুরু করি, আমাকে ঠেলে দাও।’ কিন্তু কো-রিউমিনেশন (একই সমস্যা নিয়ে বন্ধুর সঙ্গে বারবার আলোচনা) করতে থাকলে উদ্বেগ আরও বেড়ে যেতে পারে, তাই সাবধানে।
শরীর নড়াচড়া করুন: অনেক গবেষণা দেখিয়েছে যে, ব্যায়াম ডিপ্রেশন, উদ্বেগ ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার উপশমে সাহায্য করে। অতিরিক্ত চিন্তাও কমাতে পারে। ফলে ড. ফোলি বলেন, ‘শুধু ৫ মিনিট হাঁটলেও মস্তিষ্কে এন্ডোরফিনের মতো ভালো রাসায়নিক আসে।’ শরীরচর্চা আপনার নার্ভাস সিস্টেমকে ফাইট-ফ্লাইট-ফ্রিজ মোড থেকে বের করে আনতে সাহায্য করতে পারে।
স্বাস্থ্যকর ডিস্ট্র্যাকশন নিন: অতিরিক্ত চিন্তা করলে অন্যকিছুর দিকে মন দেওয়া কঠিন হয়। তাই চেষ্টা করুন স্বাস্থ্যকর কোনো ডিস্ট্র্যাকশনে মনোযোগ দিতে, যেমন—বই পড়া, সিনেমা বা সিরিজ দেখা, আপনার পছন্দের কোনো কাজ করা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। কিন্তু অ্যালকোহল, ড্রাগস বা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস দিয়ে নিজের ক্ষতি করবেন না—এগুলো অস্থায়ীভাবে শান্তি দিতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা বাড়ায়।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন: চিন্তা বেড়ে গেলে শ্বাস সাধারণত অল্প ও দ্রুত হয়। তাই ডিপ ব্রিদিং করতে পারেন।
একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো বক্স ব্রিদিং: ৪ সেকেন্ডে ধীরে শ্বাস নিন, ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন, ৪ সেকেন্ডে ধীরে শ্বাস ছাড়ুন, আবার ৪ সেকেন্ড ধরে রাখুন। এই চক্র পুনরায় করুন।
মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করুন: মাইন্ডফুলনেস মেডিটেশন মানে বর্তমান মুহূর্তে সচেতন থাকা। এটি অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন করার চেষ্টা করুন, বিশেষ করে যখন আপনি রিউমিনেট করতে শুরু করেন।
নেতিবাচক চিন্তা বন্ধ করুন: অতিরিক্ত চিন্তার সময় পরিস্থিতি অন্যভাবে দেখা কঠিন হতে পারে। কিন্তু আপনি চেষ্টা করুন চিন্তাকে দূর করতে—অন্য দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখুন।
প্রফেশনালের সাহায্য নিন: ড. ফোলি বলেন, যদি অতিরিক্ত চিন্তা আপনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচ্ছে, তাহলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদার বা আপনার প্রাইমারি কেয়ার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা ভালো। থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলর রিউমিনেশন নিয়ন্ত্রণের কৌশল শেখাতে পারবেন এবং অতিরিক্ত চিন্তার মূল কারণ (যেমন উদ্বেগ বা ডিপ্রেশন) খুঁজে বের করে চিকিৎসা করতে পারবেন।