

দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা ঢাকা জেলা পরিষদের নির্মাণাধীন ২০ তলা আধুনিক বাণিজ্যিক ভবন 'ঢাকা জেলা পরিষদ টাওয়ার' প্রকল্পে নতুন করে গতি এসেছে। পূর্ববর্তী ঠিকাদার মেসার্স তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোং লিমিটেড কর্তৃক সম্পাদিত নির্মাণকাজের যৌথ পরিমাপ ও যৌথ জরিপ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবনটির টেকনিক্যাল ভেরিফিকেশন ও টেকনিক্যাল সার্টিফিকেশন কার্যক্রমও শুরু করেছে।
ঢাকা জেলা পরিষদের অফিস আদেশ অনুযায়ী গঠিত যৌথ পরিমাপ কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর, এলজিইডি, জেলা প্রশাসন, পূর্ববর্তী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং ঢাকা জেলা পরিষদের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
কমিটির সদস্যরা হলেন- মো. রকিবুল ইসলাম, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল), গণপূর্ত অধিদপ্তর, বিভূতি মোহন পাল, নির্বাহী প্রকৌশলী (বিল্ডিং ডিজাইন), এলজিইডি, জাকিয়া মুমতাহিনা, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসন, ঢাকা, মেসার্স তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোং লিমিটেডের প্রতিনিধি, ঢাকা জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী।
আগামী কয়েকদিন ধরে চলমান এই জরিপে সম্পাদিত নির্মাণকাজের পরিমাণ, নির্মাণমান, বিদ্যমান কাঠামোর অবস্থা এবং অসমাপ্ত কাজের প্রকৃত চিত্র নিরূপণ করা হবে। এলজিইডির কারিগরি দল ভবনের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করে একটি পূর্ণাঙ্গ কারিগরি প্রত্যয়ন (টেকনিক্যাল সার্টিফিকেশন) প্রদান করবে।
কারিগরি প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়ার পর তা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদন সাপেক্ষে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুসরণ করে অবশিষ্ট নির্মাণকাজের জন্য পুনঃদরপত্র (রি-টেন্ডার) আহ্বান করা হবে।
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াছিন ফেরদৌস মোরাদ বলেন, ঢাকা জেলা পরিষদ টাওয়ার শুধু একটি ভবন নয়, এটি জেলা পরিষদের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করতে বর্তমান প্রশাসন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করছে। যৌথ জরিপ, কারিগরি যাচাই এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে অবশিষ্ট নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা হবে।
তিনি জানান, ভবনটিতে দুটি বেজমেন্ট, ২০টি তলা, প্রতিটি তলায় প্রায় ১৫ হাজার বর্গফুট ব্যবহারযোগ্য বাণিজ্যিক স্পেস এবং একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম থাকবে। অতীতে এই স্থানেই ঢাকা জেলা পরিষদের নিজস্ব কার্যালয় ছিল। বর্তমানে পরিষদের কার্যক্রম উত্তরা সেক্টর-৬-এর অস্থায়ী কার্যালয় থেকে পরিচালিত হওয়ায় নানা ধরনের প্রশাসনিক অসুবিধা হচ্ছে। তাই ভবনটির নির্মাণ শেষ হলে প্রথমেই জেলা পরিষদের নিজস্ব কার্যালয় সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে ভবনের বাণিজ্যিক স্পেসসমূহ ধাপে ধাপে লিজ দেওয়া হবে। আদালত এলাকা ও পুরান ঢাকায় আধুনিক বাণিজ্যিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। ভবনটি আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
অবশিষ্ট নির্মাণকাজে ফায়ার কম্পাইলেন্স, স্ট্র্যাকচারাল সেফটি, ইলেক্ট্রিক্যাল সেফটি, বিল্ডিং কোড, অ্যাক্সেসিবিলিটি এবং অন্যান্য জাতীয় মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়েও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. বদরুদ্দোজা শুভ বলেন, সম্প্রতি তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ও ডিডিএলজি হিসেবে কর্মরত থাকাকালে প্রতিদিন অসমাপ্ত ভবনটি দেখে তার মনে হয়েছে, এত বড় একটি সরকারি সম্পদ বছরের পর বছর জনগণের কোনো কাজে আসছে না। এখন এই প্রকল্প নিয়ে সরাসরি কাজ করার সুযোগকে তিনি ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবেও দেখছেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান প্রশাসনের উদ্যোগ, এলজিইডির কারিগরি যাচাই, যৌথ জরিপ এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের মাধ্যমে খুব শিগগিরই অবশিষ্ট নির্মাণকাজ শুরু হবে। প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে এটি ঢাকা জেলা পরিষদের অন্যতম প্রধান রাজস্ব আয়ের উৎসে পরিণত হবে এবং পুরান ঢাকার আদালত এলাকায় আধুনিক বাণিজ্যিক অবকাঠামোর নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
তিনি আরও বলেন, ভবনের বাণিজ্যিক স্পেসসমূহ সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় লিজ দেওয়া হবে। ব্যবসায়ী, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইনজীবীসহ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি আধুনিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১২ সালে ঢাকা জেলা পরিষদের নিজস্ব অর্থায়নে ২০ তলা এই ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বর্তমান প্রশাসক ইয়াছিন ফেরদৌস মোরাদ দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন। তার নির্দেশনায় যৌথ পরিমাপ কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের মনোনয়ন, এলজিইডির কারিগরি যাচাই এবং পুনঃদরপত্রের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রত্যাশা, যৌথ জরিপ, কারিগরি প্রত্যয়ন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং পুনঃদরপত্র প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে দীর্ঘদিনের স্থবির এই প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে। নির্মাণকাজ শেষ হলে এটি একদিকে যেমন ঢাকা জেলা পরিষদের দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে পুরান ঢাকার আদালত এলাকায় একটি নিরাপদ, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বাণিজ্যিক অবকাঠামো হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।