

শোবিজ অঙ্গনে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। তারকারা যেমন আলোয় থাকেন, তেমনি তাদের ঘিরে থাকে প্রশ্ন, বিতর্ক, পর্যালোচনা ও সমালোচনা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যৌক্তিক কিংবা তথ্যভিত্তিক সমালোচনাও অনেক তারকা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারছেন না। বরং প্রতিবেদন প্রকাশের পরই আইনি পদক্ষেপের হুমকি, নোটিশ কিংবা সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি ও উদ্বেগ। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী বিমানবন্দরে মদ বহনসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন। সংবাদটি প্রকাশের পরপরই অভিনেত্রী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং সংবাদটিকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, এটি তার সম্মানহানির শামিল।
এ ঘটনায় অভিনেত্রী মেহজাবীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পরপর দুটি পোস্ট দেন। প্রথম পোস্টে তিনি লেখেন, ‘কিছুদিন ধরে আমি লক্ষ করছি আমাকে নানা বিষয়ে টার্গেট করা হচ্ছে। আপনারা অনেকেই জানেন, কিছুদিন আগেও একটি মিথ্যা মামলায় আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। বিজ্ঞ আদালত সেই মামলা থেকে আমাকে অব্যাহতি দিয়েছেন, সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমি যখন নতুন করে কাজে মনোনিবেশ করেছি, ঠিক তখনই আবার আমার মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
পরবর্তী পোস্টে তার মানহানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘সাম্প্রতিক যে ঘটনাটি নিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে মানহানিকর প্রচার চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে আমি এরই মধ্যে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই। প্রথমত, উল্লিখিত কোনো ঘটনায় আমাকে কখনোই বিমানবন্দরে থামানো হয়নি। আমার কোনো হ্যান্ডব্যাগ বা লাগেজও আটকানো হয়নি; আমার লাগেজ বা হ্যান্ডব্যাগে উল্লিখিত অভিযোগের কিছু পাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। যেসব কথা ছড়ানো হচ্ছে, সেরকম কোনো ঘটনার মুখোমুখি আমি হইনি। বিমানবন্দরের কোনো কর্মকর্তা আমাকে কোনোরূপ জিজ্ঞাসাবাদও করেননি। আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার, আমার লাগেজ থেকে কিছু অবৈধ কিছু বের হওয়ার কোনো ছবি, ভিডিও বা কোনো ধরনের প্রমাণ কি আছে?’ অভিনেত্রী আরও লেখেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে মানহানি এখন খুব স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। যে খবরটি ছড়ানো হয়েছে, তার নিরিখে একটিও প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি যে আমার লাগেজে অবৈধ কিছু পাওয়া গেছে। অথচ ক্লিকবেইটের জন্য আমার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারোরই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া কাম্য নয়। আমার বিরুদ্ধে এ সব অভিযোগ অমূলক এবং আমি আবারও বলছি, এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনায় আমাকে জড়িয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে, সেই ব্যাপারে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’
তবে সংশ্লিষ্ট পত্রিকার পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা নির্ভরযোগ্য সূত্রের ভিত্তিতেই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। এ ঘটনা কেন্দ্র করে আবারও সামনে আসে—তারকারা কি সমালোচনা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত? নাকি জনপ্রিয়তার বলয়ে থেকে যে কোনো প্রশ্নকেই ‘অপপ্রচার’ হিসেবে দেখছেন?
শুধু মেহজাবীন নন, অতীতে আরও কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী সংবাদ প্রকাশের পর আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বা মামলা করার হুমকি দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার সরাসরি সংবাদমাধ্যমকে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ আখ্যা দিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। অন্যদিকে সাংবাদিকদের বক্তব্য—ভুল হলে সংশোধন বা প্রতিবাদলিপি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু শুরুতেই আইনি ভয় দেখানো সুস্থ সংস্কৃতি নয়। এতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
২০২৪ সালে চিত্রনায়িকা পরীমণিও এক নারী সাংবাদিককে মারার হুমকি দিয়ে সমালোচনা কুড়ান। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, একটি অনলাইনের নিউজ শেয়ার করে ওই নারী সাংবাদিক একটি ক্যাপশন দিয়েছিলেন, যা নায়িকার মনমতো হয়নি। আর তাতেই ক্ষেপেছিলেন নায়িকা। ২০২৩ সালে অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণও শাসিয়ে ছিলেন সাংবাদিকদের। এর কারণ ছিল, একজন গায়ক ও অভিনেতার সঙ্গে বিয়ের গুঞ্জন নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা। এর জন্যই আইনিব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দেন এ অভিনেত্রী। এদিকে ২০২৩ সালে সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার প্রতিবাদে অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে রাজধানীতে মানববন্ধন করেছিলেন বিনোদন সংবাদকর্মীরা। এর কারণ ছিল, ওই বছরের ১৬ নভেম্বর খবর ছড়ায়, অভিনেতা মুশফিক ফারহানের সঙ্গে প্রেমের জেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন অভিনেত্রী তানজিন তিশা। এ বিষয়ে জানতে তিশার সঙ্গে সাংবাদিক কথা বলতে চান। আলাপকালে ওই সাংবাদিককে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’ হুমকি দেন তিনি। পরে সেই সাংবাদিকের নামে ডিবিতে সাইবার বুলিংয়ের অভিযোগ জানান তিশা। এরকম আরও অনেক তারকা সাংবাদিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন। পরবর্তী সময়ে এর সমাধান হলেও, শিল্পী-সাংবাদিক সম্পর্কের মধ্যে একটি দাগ ফেলে যায় বলেই মনে করছেন অনেকে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারকা মানেই জনস্বার্থের অংশ। তারা বিজ্ঞাপন, নাটক-সিনেমা, সামাজিক প্রচারণা—সবকিছুর মাধ্যমে জনপরিসরে অবস্থান করেন। ফলে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি সংবাদমাধ্যমে আসতেই পারে। তবে সেটি অবশ্যই তথ্যনির্ভর ও নৈতিকতার সীমার ভেতরে হতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক সময় তারকারা সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে দেখেন। সামাজিক মাধ্যমে অনুসারীদের সামনে সাংবাদিকদের নাম উল্লেখ করে কড়া মন্তব্য করেন, কখনো সরাসরি ফোনে হুমকিও দেন—এমন অভিযোগ রয়েছে একাধিক প্রতিবেদকের। আইনজীবীদের মতে, মানহানিকর বা মিথ্যা সংবাদ প্রকাশিত হলে আইনি প্রতিকার অবশ্যই নেওয়া যেতে পারে। তবে সেটি হওয়া উচিত প্রমাণ ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়ায় নয়। কারণ, আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন সংবাদটি মানহানিকর কি না। সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারকাদের মধ্যে সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা এখনো পরিপক্ব হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহু তারকা কঠিন সমালোচনার মুখেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখেন, ব্যাখ্যা দেন বা নীরব থাকেন। কিন্তু দেশে সামান্য অভিযোগ উঠলেই সেটিকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ধরে নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়। এতে একদিকে তারকার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে গণমাধ্যমের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ে। আইনি হুমকি নয়, বরং তথ্য ও যুক্তি দিয়ে জবাব দেওয়াই হতে পারে পরিণত অবস্থান। কারণ আলোচনার সংস্কৃতি না থাকলে বিনোদন অঙ্গনেও তৈরি হবে ভয়ের পরিবেশ। যেখানে প্রশ্ন করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হবে। আর প্রশ্ন করার সংস্কৃতি যদি না থাকে, তাহলে সুস্থ সমাজ আশা করাটাও বৃথা।